স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো জোটের হয়ে নয়, দলীয়ভাবে একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে নিজেদের প্রতীকে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটিসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে এনসিপি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিকভাবে পরে ঘোষণা করবে দলটি।
এনসিপির দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি ১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের প্রস্তুতি সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে শরিকদের মধ্যে আলোচনা হয়। পরে দলের রাজনৈতিক পরিষদের বৈঠকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দলীয় সূত্রের দাবি, ঢাকার দুই সিটির প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে বিভিন্ন ধরনের সমীক্ষা চালানো হয়। সেখানে আসিফ মাহমুদকে উত্তর সিটিতে এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে দক্ষিণ সিটিতে প্রার্থী করা হলে তুলনামূলক ভালো ফলের সম্ভাবনা রয়েছে বলে উঠে আসে। মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি যাচাইয়ের পর আসিফ মাহমুদও ঢাকা উত্তরে নির্বাচন করতে সম্মতি দেন।
এর আগে গত ৩০ মার্চ ঢাকাসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য মেয়র প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছিল এনসিপি। তখন ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং ঢাকা উত্তরে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে প্রার্থী করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উত্তরে আদীবের পরিবর্তে আসিফ মাহমুদ এবং দক্ষিণে আসিফ মাহমুদের পরিবর্তে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নির্বাচন করবেন।
নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দুজনই নিজেদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। আসিফ মাহমুদ ঢাকা দক্ষিণের ভোটার এলাকা থেকে পরিবর্তন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আফতাবনগর এলাকার ভোটার হয়েছেন। অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা উত্তর থেকে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন ঢাকা-৮ সংসদীয় এলাকার ভোটার হয়েছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়ার বিধান রয়েছে। একইভাবে প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের প্রস্তাবক ও সমর্থককেও সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হতে হয়। এনসিপির নেতারা বলছেন, মেয়র নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কারণেই আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন।
গত মার্চে ঢাকার দুই সিটি ছাড়াও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটিতে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটিতে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজালকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ মেয়র পদে নির্বাচন করবেন এবং তিনি নিজে দক্ষিণে নির্বাচন করবেন। তবে দল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করার পর বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হবে।
এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ওই নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের কাছে পরাজিত হন তিনি। অন্যদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ওই নির্বাচনে অংশ নেননি।
প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়ে এনসিপির সূত্র বলছে, দলীয় সমীক্ষায় ঢাকার দুই সিটিতে সম্ভাব্য ফলাফল, প্রার্থীদের স্থানীয় রাজনৈতিক অবস্থান ও মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে। ঢাকা-৮ আসনে আগের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কারণে দক্ষিণ ঢাকায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলেও দলীয়ভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদ জানান, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে দলের সর্বোচ্চ ফোরামে আলোচনা করে তাঁদের ঢাকার দুই সিটিতে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনসহ দেশের সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী এখনো সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে ঢাকা দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম এবং ঢাকা উত্তরে মহানগর আমির সেলিম উদ্দিন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন—এমন আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে জোট, স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা লড়াই
এনসিপি ও জামায়াতের সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে শরিকদের আগ্রহ কম। স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতীতে জোটগত প্রার্থী দেওয়ার তেমন নজিরও নেই। এসব বিষয় বিবেচনায় ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা স্থানীয় নির্বাচনে নিজ নিজ দলের প্রার্থী নিয়ে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে নির্বাচনে আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ১১-দলীয় রাজনৈতিক ঐক্য বজায় থাকবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন জনস্বার্থের ইস্যুতে তারা যৌথ কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। এ লক্ষ্যে আরও তিনটি লংমার্চ এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে।
শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা যাতে স্থানীয় নির্বাচনে পরস্পরের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে না জড়ান, সে বিষয়েও সমন্বয় থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অসহযোগিতা কিংবা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হলে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকেরা যৌথভাবে প্রতিবাদ করবে।
জামায়াতে ইসলামী ছাড়া ১১-দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, রাজনৈতিকভাবে ১১ দল একসঙ্গে এগিয়ে যাবে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলো আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তাঁদের নির্বাচনী প্রচারে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করা হবে না; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাঁরা অবস্থান নেবেন।