বছর ঘুরে আবারও মুসলিম উম্মাহর দ্বারে উপস্থিত পবিত্র ঈদুল আজহা– ত্যাগ, আনুগত্য ও মহান আত্মসমর্পণের এক অনন্য উৎসব। হিজরির দ্বিতীয় সালে (২ হিজরি) থেকে ঈদুল আজহার নামাজ ও কুরবানির বিধান চালু হয়। তবে এই ঈদ শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানবিকতা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও আত্মশুদ্ধির চিরন্তন শিক্ষা বহন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও ঈদ শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে তোলে পরিবারে ফেরা, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং শৈশবের স্মৃতিময় উষ্ণতা। ঈদুল আজহার ধর্মীয় তাৎপর্য, ত্যাগের শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি ও ব্যক্তিগত আবেগ–অনুভূতি নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা। সেই অনুভূতির চিত্রই তুলে ধরেছেন কুবি প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইব্রাহীম।
“কোরবানি আনুগত্যের শিক্ষা দেয়”
~ আবরার আহমদ আশরাফী
শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ
কুরবানী শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আমাদের জন্য ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের শিক্ষা। কুরবানীর ইতিহাস আমাদের হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের আদর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়। যা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি মনে করি, কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও সমাজে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। কেবল পশু কুরবানিই নয়, আমাদের অহংকার, হিংসা ও খারাপ কাজগুলোও ত্যাগ করা জরুরি। পাশাপাশি কুরবানির মাংস সঠিকভাবে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোও আমাদের দায়িত্ব।
“কোরবানি সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয় ”
~ আশরাফুন্নেসা নেছা বীথি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
ইদুল আজহা আমাদের ত্যাগ,আত্নশুদ্ধি ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়৷ আমার কাছে এটা শুধু আনন্দের উৎসব নয় বরং আত্মশুদ্ধির একটি অন্যতম সময়। পশু কুরবানির মাংস আত্নীয় স্বজন ও গরীবদের মধ্যে বিতরণের মধ্য দিয়ে সমাজে সমতা ও আন্তরিকতার এক অপূর্ব উদাহরণ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের মতো এই ঈদেও পরিবারের সবাই একত্রে আনন্দ উপভোগ করতে পারে, যা আমাদের মতো ঘর থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম প্রশান্তির বিষয়। আমি মনে করি, ইদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা যদি আমরা সারা বছর ধারন করি তাহলে সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য আরও বৃদ্ধি পাবে।
“ঈদ মানেই বাড়ি ফেরার আনন্দ”
~ জেসমিন রেজা
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
প্রতি বছর ঈদ-উল-আযহা আমাদের জীবনে এক অনন্য আবেগ ও চিন্তার সংমিশ্রণ নিয়ে আসে। পরীক্ষার চাপ, ক্লাসের ব্যস্ততা আর হোস্টেলের একঘেয়েমি ছেড়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ যেন তাদের মনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। ঈদের দিনগুলোতে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ানো, বাসে-ট্রেনে গাদাগাদি করে বাড়ি ফেরা সবকিছুর মাঝেও মুখে ফুটে ওঠে অপার্থিব এক হাসি। কুরবানির এই ঈদ আমাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, বরং ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক মহান দর্শন।ক্যাম্পাসে ফিরে এসে বন্ধুদের সঙ্গে কুরবানির মাংস ভাগাভাগি করা, গ্রামের দরিদ্র প্রতিবেশীদের মুখে হাসি ফোটানো এসব অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে সমাজসেবার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
“কোরবানি সমাজে সহমর্মিতা ও মানবতার চর্চাকে দৃঢ় করে ”
~ কাওসার প্রধান
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
পবিত্র ঈদ- উল-আযহায় গরু কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং ত্যাগের মহিমার প্রতীক। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি করার মাধ্যমে মানুষ আত্মত্যাগের শিক্ষা লাভ করে। কোরবানির মাংস আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করার মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা ও মানবতার চর্চা আরও দৃঢ় হয়।তবে ঈদের আনন্দ ও কোরবানির তাৎপর্যের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। কোরবানির পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য বর্জ্য যথাযথভাবে নির্দিষ্ট স্থানে অপসারণ না করে যেখানে-সেখানে ফেলে দিলে তা দ্রুত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং জীবাণু ছড়িয়ে পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে তোলে। এতে জনস্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তেমনি নষ্ট হয় ঈদের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতার। আশাকরি এ বিষয়ে আমরা সবাই যত্নশীল হবো।
মন্তব্য করুন