রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর আওতায় রিকশার নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, জোনভিত্তিক চলাচল এবং জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট আট লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি পেতে পারে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘ই-মোবিলিটি ও ব্যাটারি সোয়াপিং সিস্টেম রোল-আউট পরিকল্পনা (ঢাকা শহর)’ শীর্ষক নথির বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে কালবেলা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে চারটি করে মোট আটটি জোনে ভাগ করা হবে। প্রতিটি জোনে নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা চলাচল করবে। এক জোনের নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে প্রবেশ করতে পারবে না। পাশাপাশি প্রধান সড়কে এসব যান চলাচলের অনুমতি থাকবে না।
গত ১৩ ও ৩০ আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দুটি সভায় রিকশার নিবন্ধন, চলাচলের রুট, চালকের লাইসেন্স, উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাটারি চার্জিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা ও একাধিক সিদ্ধান্ত হয়।
সরকারি নথির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা মহানগরে প্রায় ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। ঢাকার বাইরে রয়েছে আরও প্রায় ৪০ লাখ। এসব রিকশার নিবন্ধন না থাকায় যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দুই হাজার ২৫০ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ সিটির এক হাজার ১৭০ কিলোমিটার ফিডার সড়কে চার লাখ করে মোট আট লাখ রিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা রয়েছে।
রিকশার অবস্থান ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে জিপিএস এবং জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি জোনের রিকশায় আলাদা রং ও নম্বরপ্লেটে বিশেষ কোড থাকবে। এতে কোনো রিকশা নির্ধারিত এলাকার বাইরে গেলে তা শনাক্ত করা সহজ হবে।
নতুন পরিকল্পনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অনুমোদিত মডেলের ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধনের পর সড়কে নামানোর প্রস্তাব রয়েছে। পুরোনো রিকশা পরিবর্তনের জন্য এক্সচেঞ্জ কর্মসূচিও চালু করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুরোনো রিকশার মূল্য নতুনটির দামের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। অবশিষ্ট অর্থ মালিক নিজে অথবা ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবেন।
দেশীয় দুই আসনের নতুন রিকশার সম্ভাব্য দাম ধরা হয়েছে এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা।
খসড়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হবে। প্রতিটি রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে সর্বোচ্চ ১০ বছর। মেয়াদ শেষ হলে নিবন্ধন বাতিল হবে।
সিটি করপোরেশন এলাকায় দুই আসনের রিকশার জন্য এককালীন নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি তিন হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
চালকের লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম আসতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নাগরিকরা জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে ৫০০ টাকা ফি দিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি লাইসেন্স নিতে পারবেন। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
অন্যদিকে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ বন্ধে নির্ধারিত চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রচলিত চার্জিং ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ব্যাটারি সোয়াপিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এক থেকে দেড় মিনিটের মধ্যে ব্যবহৃত ব্যাটারি বদলে সম্পূর্ণ চার্জ করা ব্যাটারি লাগানো সম্ভব হবে।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, চার লাখ রিকশার জন্য স্টেশনের সক্ষমতা অনুযায়ী এক হাজার থেকে ছয় হাজার ব্যাটারি সোয়াপিং স্টেশন প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিটি স্টেশন স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ ধরা হয়েছে এক কোটি ২৯ লাখ টাকা।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে গ্রিন ফান্ড থেকে ৭০ শতাংশ, সরকারি প্রণোদনা থেকে ২০ শতাংশ এবং উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ থেকে বাকি ১০ শতাংশ অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব রয়েছে।
তবে নিবন্ধন ফি, জোনভিত্তিক চলাচল ও অন্যান্য শর্ত এখনো প্রস্তাবনার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পর এসব নিয়ম কার্যকর হবে।