ইসলামে নারীর মর্যাদা – দৈনিক দেশেরকথা
arif khanh
৬ এপ্রিল ২০২৬, ৬:২৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইসলামে নারীর মর্যাদা

ইসলামের ইতিহাসকে সাধারণত পাঁচটি যুগে ভাগ করা হয়। ইসলাম পূর্ব যুগ বা জাহেলি যুগ, ইসলামী যুগ, আব্বাসীয় যুগ, উসমানীয় যুগ এবং রেঁনেসার যুগ। ইসলাম পূর্ব যুগে নারীরা ছিল অবহেলার পাত্র। সমাজে তাদের ছিলনা কোনো মর্যাদা, ছিলনা কোনো সম্মান। তাদেরকে মনে করা হতো সমাজ ও পরিবারের বোঝা। আর ঠিক সেই সময়টাতে আগমন ঘটে একজন মহামানবের নাম তার মোহাম্মদ (স.)। তিনি ছিলেন না কেবলই একজন নবী, তিনি ছিলেন এক বিপ্লবী, প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক, সমাজের ঘোর অন্ধকার বেদ করে আলোর মশাল জ্বালানো এক অগ্নিশিখা।

নারী যখন ছোট কন্যাশিশু: জাহেলিয়াতের সেই যুগে একটি শিশুর মেয়ে হিসেবে জন্মগ্রহণ করা ছিল তার এবং তার মায়ের বড় এক অপরাধ। আর এই অপরাধের দায়ে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো এবং তার মায়ের উপর নেমে আসত অবর্ণনীয় নির্যাতন। আর ঠিক সেই সময়ে আল্লাহর নবী এই ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পাল্টা ঘোষণা করেন- আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন মায়ের অবাধ্যতা, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া, কারো প্রাপ্য না দেয়া এবং অন্যায়ভাবে কিছু নেয়া আর অপছন্দ করেছেন অনর্থক বাক্য ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা, আর মাল বিনষ্ট করা। (বুখারী: ২৪০৮)। এছাড়াও তিনি বলেছেন- যার গৃহে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল, অতঃপর সে তাকে কষ্ট দেয়নি, তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়নি এবং পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য দেয়নি, তাহলে ওই কন্যার কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২২৩)।‌ নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুজন কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করেছে এবং বিয়ের সময় হলে তাদের সুপাত্রে বিয়ে দিয়েছে, সে এবং আমি জান্নাতে এভাবে একসঙ্গে থাকব।’ এরপর তিনি নিজের দুই আঙুল মিলিয়ে দেখালেন। (তিরমিজি: ১৯১৪; মুসলিম: ২৬৩১; মুসনাদে আহমাদ: ১২০৮৯)।

নারী যখন পরামর্শদাতা: জাহেলি যুগে কোনো নারী পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কোনো বিষয়ে পরামর্শ বা মতামত দিবে আর পুরুষরা তা মনযোগ সহকারে শুনবে এটা ছিল কল্পনাতীত। কেননা তখনকার সমাজে নারীদের মতামতের কোনো মূল্য ছিল না।  পুরুষদের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কিন্তু রাসুলের জীবনীতে ফুটে উঠে ভিন্ন চরিত্র। যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও তিনি কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করেছেন। যেমনটা আমরা দেখতে পাই হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আম্মাজান হযরত  উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে আলোচনা করেন এবং ওনার পরামর্শ মোতাবেক কার্য সম্পাদন করেন। (সহীহ বুখারী: ২৭৩১ এর আলোকে)

নারী যখন অপবাদের শিকার: একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে তার সম্মান। সম্মান যদি নষ্ট হয়ে যায় বা চরিত্রে যদি কালিমা লেপন হয় তাহলে সেই জীবনের আর কোন মূল্য থাকে না।  আর সমাজে বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এটি একটু বেশিই স্পর্শকাতর। আর এজন্য আল্লাহ তা’আলা বলেছেন- যারা সচ্চরিত্রা সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব। (সূরা নূর: ২৩)। আর এখানেই শেষ নয় দুনিয়াতেও রয়েছে তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ বলেছেন- আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক। (সূরা নূর: ০৪) আর ইসলাম নারীদের সম্মানের প্রশ্ন এতটাই সচেষ্ট যে, আমরা দেখতে পাই হযরত আম্মাজান হযরত আয়েশা রাঃ এর ওপর মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর নেতৃত্বে কতিপয় মুনাফিকেরা একটি অপবাদ রটালে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের আয়াত নাজিল করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পবিত্রতা বর্ণনা করেন। আর এই মহা অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার জন্য রাসূলে করীম সাঃ তাঁর উম্মতকে আদেশ করে গেছেন। তিনি বলেছেন- সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। যার মধ্যে একটি হচ্ছে- সরল স্বভাবা সতী-সাধ্বী মু’মিনাদের অপবাদ দেয়া। (সহীহ বুখারী: ২৭৬৬)

নারী যখন অন্যের স্ত্রী: যখন সমাজে নারীদের ভোগ্যপণ্য বৈ অন্য কিছু হিসেবে মূল্যায়ন করা হতো না তখন রসূলুল্লাহ (স.) তাদেরকে উত্তম সম্পদ হিসেবে অবিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন- গোটা দুনিয়াই হলো সম্পদ। আর দুনিয়ার মধ্যে পুণ্যবতী স্ত্রীলোকের চেয়ে অধিক উত্তম কোন সম্পদ নাই। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫৫)। এতটুকু বলেই তিনি ক্ষান্ত হননি অন্য হাদিসে তিনি আরো বলেছেন- তোমাদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। (তিরমিযী: ৩৮৯৫)।

নারী যখন একজন মা: মায়ের জাতি সম্মানিত জাতি। আর ইসলাম মায়েদের যথাযথ সম্মান দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সদাচার প্রাপ্তির অগ্রগণ্য ব্যক্তি কে? তিনি বলেনঃ তোমার মা। তিনি বলেন, তারপর কে? তিনি বলেন- তোমার মা। তিনি বলেন, তারপর কে? তিনি বলেন- তোমার মা। তিনি বলেন, তারপর কে? তিনি বলেন- তোমার পিতা (বুখারী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ, তাহাবী)। অত্র হাদিসে আমরা দেখতে পাই, সদাচর প্রাপ্তির দিক থেকে ইসলাম পুরুষদের চেয়ে নারীদের এগিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ, পিতার চেয়ে মাতাকে প্রধান্য দিয়েছেন। এছাড়াও সিরাত গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই যে, বিশ্বনবী তাঁর দুধ মাতা হালিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সম্মানে তাঁর বসার জন্য নিজের গায়ের পবিত্র চাদর খুলে বিছিয়ে দিয়েছিলেন।

নারী যখন সম্পদের হকদার: আল্লাহ তা’আলা পুরুষের সম্পদে বহুজনকে হকদার সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু নারীদের সম্পদ কেবল তাদেরই। সেখানে কারো কোনো অংশীদারিত্ব নেই। একজন নারী তার ইচ্ছে অনুযায়ী তার সম্পদ যে কোন হালাল খাতে ব্যয় করতে পারে। শরীয়ত কাউকে এই অধিকার দেয় নাই যে, কোন নারীর সম্পদে সে নিজেকে অংশীদার দাবি করবে। এমনকি তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী, সন্তান-সন্ততি কেউ তার সম্পদ নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে না যদি না সেই নারী স্বেচ্ছায় তাদেরকে তা ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে থাকে। এক কথায় আল্লাহ তায়ালা নারীদের সম্পদ ব্যয়ের খাত নির্ধারিত করে দেন নায়, যেমনটা করে দিয়েছেন পুরুষদেরকে। মেয়েদের সম্পদ প্রাপ্তির অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে উত্তরাধিকার। উত্তরাধিকারসূত্রে পুরুষরা যেমন সম্পদ পেয়ে থাকে একইভাবে নারীরাও পেয়ে থাকে। কিন্তু ইসলামপূর্ব যুগে মহিলা ও ছোট শিশুদেরকে এই উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত। বড় ছেলে যে যুদ্ধের উপযুক্ত হত, কেবল সেই সমস্ত মালের অধিকারী হত। এজন্য মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- পুরুষদের জন্য মাতা পিতা ও নিকটাত্মীয়রা যা রেখে গিয়েছে তা থেকে একটি অংশ রয়েছে। আর নারীদের জন্য রয়েছে মাতা পিতা ও নিকটাত্মীয়রা যা রেখে গিয়েছে তা থেকে একটি অংশ- তা থেকে কম হোক বা বেশি হোক- নির্ধারিত হারে। (সূরা নিসা: ০৭)। এছাড়াও মহিলারা বিয়ের সময় স্বামীর থেকে প্রাপ্ত মোহরানার মাধ্যমে সম্পদের মালিক হয়। আর সেই মোহরানা দিতে যেন কোন স্বামী কার্পণ্যতাবোধ না করে সেজন্য আল্লাহতালা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন- আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। (সূরা নিসা: ০৪)

ইসলাম ন্যায্যতা ও ইনসাফের ধর্ম। ইসলাম নারীদেরকে ঠিক ততটুকুই মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছে যতটুকু সে প্রাপ্য।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভেড়ামারা ১২মাইল এলাকায় বারি উদ্ভাবিত তিল ফসলের উপযোগিতা পরীক্ষার উপর মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত

দেশের উন্নয়ন ধরে রাখতে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ইমামতি ছেড়ে পালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি, অবশেষে গ্রেফতার

অন্যের রিজিক নষ্ট করলে কী শাস্তি? তওবা করলে কি ক্ষমা পাওয়া যায়?

শিশু আয়াত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেল আসামি আবির

জিজ্ঞাসাবাদে দায় অস্বীকার মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার

৭২ ঘণ্টা পেরিয়েও সীমান্তে আটকে ৯ জন, ফেরত নিতে অস্বীকৃতি বিএসএফের

২৬ জুন সারাদেশে পালিত হবে পবিত্র আশুরা

সমঝোতাকে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরছে ইরান, তবে রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন

মেসির প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকে উড়ে গেল আলজেরিয়া, দারুণ সূচনা আর্জেন্টিনার

১০

মৌলভীবাজার সফরে সিলেট পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

১১

রেল যোগাযোগের আওতায় আসছে আরও ১০ জেলা, জানালেন রেলপথমন্ত্রী

১২

বিশ্বকাপে কোন দলের সমর্থক? ইঙ্গিতে জানালেন প্রধানমন্ত্রী

১৩

ঢাকায় ট্রাকের ধাক্কায় নিহত জুলাইযোদ্ধা ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আবু জুবায়ের

১৪

রামিসা হত্যা : হাইকোর্টে শুনানির জন্য পেপারবুক প্রস্তুত, শুরু হতে পারে যেকোনো দিন

১৫

৬ শিশুকে দায়িত্বহীনভাবে রেখে মেরে ফেলবে, তা হতে পারে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

১৬

বিমানবন্দরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করানোর প্রতিবাদে ভারতে প্রবেশ করিনি: জাহেদ উর রহমান

১৭

আলজেরিয়ার বিপক্ষে শক্তিশালী একাদশে নামতে পারে আর্জেন্টিনা, ফিরছেন মেসি

১৮

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক সভা চলমান

১৯

মহাখালীতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, তীব্র যানজটে ভোগান্তি

২০