মানুষের জীবনে এমন সময় আসে, যখন চারদিকে শুধু অভাব, অনাহার, দ্রব্যমূল্যের আগুন, কর্মসংস্থানের সংকট আর অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরিবারে খাবারের টান, ঋণের চাপ, ব্যবসায় লোকসান কিংবা দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। এই কঠিন সময়ে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া। কারণ রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ, তিনিই সংকট দেন, আবার তিনিই সংকট দূর করেন।
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, দুর্ভিক্ষ, খাদ্যাভাব, মহামারি কিংবা দারিদ্র্য যখন সমাজকে গ্রাস করে, তখন কেবল অভিযোগ নয়, বরং তওবা, ইস্তিগফার, দোয়া ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। কুরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কিছু দোয়া ও আমল রয়েছে, যা দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক সংকটের সময় নিয়মিত পড়লে আল্লাহ তাআলা রহমত বর্ষণ করেন এবং রিজিকের দরজা খুলে দেন।
নিচে সহিহ হাদিস ও কুরআনের আলোকে দুর্ভিক্ষ ও কঠিন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো তুলে ধরা হলো।
১. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
দুর্ভিক্ষের সময় সবচেয়ে বড় আমল হলো ইস্তিগফার। কারণ মানুষের গুনাহ, জুলুম ও অন্যায়ের কারণে অনেক সময় রিজিকের বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইস্তিগফারের মাধ্যমে বৃষ্টি ও রিজিক বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ বলেন,
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا
وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ
وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
অর্থ: আমি বললাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদ-নদী তৈরি করবেন।
(সূরা নূহ: ১০-১২)
ইস্তিগফারের উত্তম দোয়া
أَسْتَغْفِرُ اللهَ
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
দিনে অন্তত ১০০ বার পড়ার চেষ্টা করবেন।
২. সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পড়া
এটি ইস্তিগফারের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দোয়া। সহিহ হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় এ দোয়া পড়ে মারা যায়, সে জান্নাতি হবে।
দোয়া (আরবি)
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ
وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ
أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ
أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ
وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي
فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
অর্থ
হে আল্লাহ, আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী আপনার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ওপর আছি। আমি যা করেছি তার অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আপনার দেয়া নিয়ামত স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। কারণ আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।
সহিহ হাদিসের সূত্র
সহিহ বুখারি
৩. দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় চাওয়া
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দারিদ্র্যকে ভয় করতেন এবং নিয়মিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। দুর্ভিক্ষের সময় এই দোয়া নিয়মিত পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ
অর্থ
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় চাই।
সহিহ সূত্র
সুনানে আবু দাউদ (সহিহ)
৪. ঋণ ও অভাব থেকে মুক্তির দোয়া
দুর্ভিক্ষ বা অর্থনৈতিক সংকটে মানুষ ঋণের বোঝায় পড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণ থেকে মুক্তির একটি দোয়া শিখিয়েছেন।
দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ
وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ
وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ
وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
অর্থ
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাই। অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই। ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে আশ্রয় চাই। ঋণের চাপ ও মানুষের দমন থেকে আশ্রয় চাই।
সহিহ সূত্র
সহিহ বুখারি
৫. বরকত বৃদ্ধির দোয়া
অভাবের সময় শুধু আয় বাড়ানো নয়, বরং বরকত বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অল্পেও যেন পরিবারের জন্য যথেষ্ট হয়, এটাই বরকত। রাসুল (সা.) বরকতের দোয়া করতেন।
দোয়া
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيمَا رَزَقْتَنَا
অর্থ
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যে রিজিক দিয়েছেন তাতে বরকত দান করুন।
সূত্র
তিরমিজি (হাসান)
৬. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা
দরুদ শরিফ এমন এক ইবাদত, যা দুঃখ-কষ্ট দূর করে, গুনাহ মাফ করে এবং দোয়া কবুলের রাস্তা সহজ করে। সংকটের সময় দরুদ শরিফ অধিক পরিমাণে পড়া অত্যন্ত উপকারী।
দরুদ ইব্রাহিম
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ
كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ
إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ
كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ
إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরিবারবর্গের ওপর রহমত বর্ষণ করুন… (পূর্ণ অর্থ সালাতে রয়েছে)
৭. লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ বেশি পড়া
এই দোয়া জান্নাতের গুপ্ত ধনভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। কঠিন সময়, দুর্ভিক্ষ ও অসহায় অবস্থায় এটি খুবই শক্তিশালী আমল।
দোয়া
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ
অর্থ
আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই, কোনো সামর্থ্য নেই।
সহিহ সূত্র
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
৮. খাবার ও রিজিক বৃদ্ধির দোয়া
রাসুল (সা.) আল্লাহর কাছে উপকারী রিজিক চাইতেন।
দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ رِزْقًا طَيِّبًا وَعِلْمًا نَافِعًا وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
অর্থ
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে পবিত্র রিজিক, উপকারী জ্ঞান এবং কবুলযোগ্য আমল চাই।
সূত্র
ইবনে মাজাহ (সহিহ)
৯. সাদাকা ও দান করার গুরুত্ব
দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ দান করতে ভয় পায়। কিন্তু ইসলাম বলেছে, দান সম্পদ কমায় না বরং বাড়ায়। দরিদ্রকে সাহায্য করলে আল্লাহ রহমত দেন, সমাজে বরকত ফেরে এবং বিপদ দূর হয়।
হাদিস
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ
অর্থ: সদকা করলে সম্পদ কমে না।
(সহিহ মুসলিম)
দুর্ভিক্ষের সময় সামর্থ্য অনুযায়ী চাল, ডাল, পানি, খাবার, ওষুধ বা নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করা বড় ইবাদত।
১০. কুরআন তিলাওয়াত ও সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পড়া
কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে শক্তি দেয় এবং আল্লাহর রহমত ডেকে আনে। বিশেষ করে রিজিক ও বরকতের নিয়তে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পড়া মুসলিম সমাজে বহুল প্রচলিত একটি আমল। তবে এটি হাদিসের দিক থেকে সব বর্ণনা শক্ত নয়। কিন্তু কুরআন তিলাওয়াত নিজেই বরকতের মাধ্যম।
দুর্ভিক্ষের সময় নিয়মিত কুরআন পড়া, অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং আমল করা অত্যন্ত জরুরি।
১১. বেশি বেশি তওবা করা
দুর্ভিক্ষ ও সংকট আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হতে পারে, আবার সতর্কবার্তাও হতে পারে। তাই গুনাহ থেকে ফিরে আসা জরুরি।
তওবার শর্ত হলো
১. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া
২. অনুতপ্ত হওয়া
৩. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত
৪. মানুষের হক নষ্ট করলে তা ফেরত দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া
আল্লাহ তওবা কবুল করলে সংকটের দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং রহমতের দরজা খুলে যায়।
১২. বৃষ্টির জন্য দোয়া (ইস্তিসকা)
যখন বৃষ্টি কমে যায়, জমি শুকিয়ে যায়, কৃষিতে ক্ষতি হয় এবং খাদ্য সংকট দেখা দেয়, তখন রাসুল (সা.) সাহাবাদের নিয়ে বিশেষভাবে বৃষ্টির সালাত আদায় করতেন।
বৃষ্টির দোয়া
اللَّهُمَّ أَغِثْنَا
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের সাহায্য করুন (বৃষ্টি দিন)।
সহিহ সূত্র
সহিহ বুখারি
১৩. সকালে ও সন্ধ্যায় যিকির
রাসুল (সা.) সকাল-সন্ধ্যার যিকিরকে নিরাপত্তার ঢাল বলেছেন। দুর্ভিক্ষ ও সংকটে এগুলো মানুষকে মানসিক শক্তি দেয় এবং আল্লাহর সাহায্য টেনে আনে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ যিকির
حَسْبِيَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ
عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ
وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
অর্থ
আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁর ওপর ভরসা করেছি, আর তিনি মহান আরশের রব।
১৪. দোয়া কবুলের বিশেষ সময়গুলো কাজে লাগানো
দুর্ভিক্ষের সময় শুধু দোয়া পড়লেই হবে না, বরং দোয়া কবুলের সময়গুলোকে কাজে লাগাতে হবে। যেমন
ফজরের পর
আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়
সিজদায়
জুমার দিনের বিশেষ সময়
বৃষ্টির সময়
ইফতারের আগে
শেষ রাতে তাহাজ্জুদের সময়
এই সময়গুলোতে কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ নিরাশ করবেন না।
১৫. তাহাজ্জুদ নামাজ ও গভীর রাতে কান্না
দুর্ভিক্ষ ও চরম অভাবের সময় তাহাজ্জুদ নামাজ এক মহাশক্তিশালী ইবাদত। শেষ রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দার ডাকে সাড়া দেন।
রাসুল (সা.) বলেছেন,
আমাদের রব প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে আমি তাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করব?
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
দুর্ভিক্ষের সময় একজন মুসলিমের করণীয় বার্তা
দুর্ভিক্ষ বা খাদ্যসংকট শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি ঈমানেরও পরীক্ষা। এই সময় সমাজে মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা বাড়ে, মানুষ খাদ্য মজুত করে, দুর্বলদের ঠকায়। কিন্তু ইসলাম শিখিয়েছে, দুর্ভিক্ষের সময় মুমিন হবে সহানুভূতিশীল, দানশীল ও আল্লাহভীরু।
যদি একজন মানুষ তার ঘরে অল্প খাবার রেখেও প্রতিবেশীর ক্ষুধা মেটায়, তবে আল্লাহ তার ঘরকে বরকত দিয়ে পূর্ণ করে দেন। আর যে ব্যক্তি মজুতদারি করে মানুষের কষ্ট বাড়ায়, তার রিজিক থেকে বরকত তুলে নেওয়া হয়।
শেষ কথা
দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ যখন আশাহীন হয়ে পড়ে, তখন মনে রাখতে হবে রিজিকের মালিক বাজার নয়, সরকার নয়, ধনী শ্রেণি নয়, বরং একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ চাইলে অল্প খাবারেও বরকত দেন, আবার চাইলে প্রাচুর্যের মাঝেও অভাব রেখে দেন।
তাই এই সংকটের সময় আমাদের উচিত বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, দরুদ পড়া, দান করা, তাহাজ্জুদ পড়া এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে সাহায্য চাওয়া। আল্লাহর দরবারে হাত উঠলে কখনোই তা খালি ফেরে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট, দারিদ্র্য ও অভাব থেকে হেফাজত করুন। আমিন।