চোখে আলো নেই, কিন্তু বুকে রয়েছে এক অদম্য জীবনসংগ্রামের সাহস। অন্ধত্ব তাকে থমকে দিতে পারেনি; বরং পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে নামছেন ফরিদপুরের সদরপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী যুবক জুয়েল মোল্যা (৪০)। ভিক্ষাবৃত্তির সহজ পথ না বেছে, কষ্টার্জিত উপার্জনে সততার সাথে সংসার চালিয়ে সমাজকে দেখাচ্ছেন এক বিরল দৃষ্টান্ত।
সদরপুর উপজেলার পশ্চিম শ্যামপুর গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছোট ছেলে জুয়েল। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পারিবারিক সূত্র জানায়, মাত্র সাত মাস বয়সে মরণব্যাধি টাইফয়েড জ্বর ও হামে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। সেই থেকে চারপাশের রঙিন পৃথিবী তার কাছে শুধুই অন্ধকার। তবে সেই অন্ধকারকে জয় করে আজ তিনি স্বাবলম্বী।
জুয়েলের চারজনের সংসার— বৃদ্ধা মা, স্ত্রী এবং ১০ বছর বয়সী চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া এক ছেলে। সংসারের অভাব ঘোচাতে জুয়েলের মা এখনো বাসা-বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। তবে পরিবারের মূল হাল ধরেছেন জুয়েল নিজেই।
প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই হাতে একটি বাঁশের লাঠি আর কাঁধে বাদামের ডালা নিয়ে বের হয়ে পড়েন জুয়েল। হাতের সেই লাঠিটিই যেন তার পথের একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী। লাঠির ওপর ভর দিয়ে তিনি পৌঁছে যান সাড়ে সাতরশি বাজার, সদরপুর বাজারসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায়। দিনভর ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করে যা আয় হয়— দৈনিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা— তা দিয়েই চলে তার চার মুখের সংসার ও ছেলের পড়াশোনার খরচ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অন্ধত্বের দোহাই দিয়ে জুয়েল কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি। তার এই আত্মমর্যাদা আর কঠোর পরিশ্রমের গল্প পুরো এলাকার মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
নিজের জীবনসংগ্রাম নিয়ে জুয়েল জানান, "চোখে আলো নেই বলে তো আর বসে থাকলে চলবে না। পরিবারকে তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নিজের পরিশ্রমে আয় করে যখন দিনশেষে বাড়ি ফিরি, তাতেই শান্তি।"
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যেখানে অনেককেই হতাশ করে দেয়, সেখানে জুয়েল মোল্যার এই অদম্য প্রচেষ্টা সমাজের জন্য এক অনন্য বার্তা। অন্ধত্ব জীবনকেও যে থমকে দিতে পারে না, জুয়েল মোল্যা তার জলন্ত প্রমাণ। তার এই জীবনসংগ্রামকে সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষ সাদরে সম্মান জানান।