প্রবল ঝাঁকুনির ভয় এখনও কাটেনি জনগণের মন থেকে। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর মাত্র সাড়ে ৩১ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশে আরও তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নরসিংদী ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হওয়া এই কম্পনগুলো নতুন করে বড় বিপদের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
শুক্রবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী, কেন্দ্র ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। এই ঘটনায় তিন জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন, আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক মানুষ। ঢাকার বহু ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কোথাও কোথাও ভবন হেলে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে প্রায় সাত কোটি মানুষ কম্পন অনুভব করেছেন।
এর পর শনিবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে নরসিংদীর পলাশে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার আরেকটি কম্পন হয়। সন্ধ্যায় আবার পরপর দুটি ভূমিকম্প— একটি রাজধানীর বাড্ডায় ৩ দশমিক ৭ মাত্রায় এবং সেকেন্ডের ব্যবধানে আরেকটি ৪ দশমিক ৩ মাত্রার কম্পন নরসিংদীতে অনুভূত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প সময়ে বারবার এই ঝাঁকুনিগুলো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, একই এলাকায় ধারাবাহিক কম্পন বড় ভূমিকম্পের সংকেত দেয়। তিনি বলেন, আগামী চার থেকে পাঁচ দিন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ দুটি সক্রিয় প্লেট— ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাব-প্লেট ও ফল্ট লাইনের কারণে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে দুই থেকে তিন লাখ মানুষ হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সাথে প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে।
২০০৯ সালে সিডিএমপি ও জাইকার যৌথ জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অন্তত ৭২ হাজার ভবন সরাসরি ভেঙে যাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে আরও এক লাখ ৩৫ হাজার ভবন। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলও একইভাবে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, এই অঞ্চলে গড়ে দেড়শ বছর অন্তর ৭ মাত্রার এবং আড়াইশ থেকে তিনশ বছর অন্তর ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ফলে ২০২০ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল।
বিএমডির পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শুক্রবারের বড় ভূমিকম্পের পর বাকি তিনটি ‘আফটারশক’। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ; তাই আতঙ্ক নয়, বরং নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
জনবহুল ঢাকা মহানগরী এবং আশপাশের এলাকায় ক্রমাগত এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত প্রস্তুতি গ্রহণ করলে ক্ষতি কমানো সম্ভব— নচেৎ বিপর্যয় হতে পারে ভয়াবহ।
মন্তব্য করুন