ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত বছরের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় আওয়ামী লীগের অতীতের অনেক অর্জন ম্লান হয়ে গেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ওই সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে দলটির ভাবমূর্তি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকেও রাজপথে সক্রিয় থাকতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতির একপর্যায়ে দলীয় প্রধান দেশ ছাড়েন এবং শীর্ষ নেতাদের অনেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।
গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা দেখা গেছে। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পর কয়েকটি এলাকায় দলটির কার্যালয় খোলার খবরও পাওয়া গেছে। এতে করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টার ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে।
তবে বিষয়টিকে স্থানীয় পর্যায়ের ঘটনা হিসেবে দেখছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দলটির নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাদের কার্যক্রম আইনগতভাবেই মোকাবেলা করা হবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে এবং এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, বিএনপি জোর-জবরদস্তি করে কোনো কিছু বন্ধ করার পক্ষে নয়। তবে যেহেতু দলটি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ, তাই তারা আইন ভঙ্গ করুক—সেটাও বিএনপি চায় না।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধু আইনি পদক্ষেপে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির অঙ্গন থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে না। তাদের মতে, এত বড় গণঅভ্যুত্থান ও সহিংসতার ঘটনার পর দলটিকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা প্রয়োজন, যা অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর দায়িত্ব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, আইনের পরিবর্তন সমাজের উপরিভাগে প্রভাব ফেলে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন না এলে সেই পরিবর্তন টেকসই হয় না। তিনি বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে মানুষ তাদের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন পেয়েছে—তার ওপরই নির্ভর করবে আন্দোলনের মূল্যায়ন।
রাজনীতি বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, আন্দোলনের সময়কার সহিংসতার অনেক দৃশ্য মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে দেখেছে। নিহতদের স্বজনদের কান্না ও প্রতিবাদও মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তার মতে, এসব ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসা কঠিন হবে।
বিএনপি নেতারা নিজেদেরকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারক হিসেবে তুলে ধরতে চান। তাদের মতে, কোনো রাজনৈতিক দলকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত জনগণের।
মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আওয়ামী লীগ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি এবং রাজনৈতিকভাবে এমন কোনো দল নয় যে সহজেই বিলীন হয়ে যাবে। তবে যেসব নেতা বা কর্মী কোনো নির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত নন এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না, তাদের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়ার বিষয়টি আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে।
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝে মধ্যে তাদের বক্তব্য দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত দেশের মাটিতে প্রকাশ্যে তাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।
মন্তব্য করুন