সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’-তে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন পরীক্ষা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
[রয়টার্সের প্রতিবেদন](https://www.reuters.com/world/asia-pacific/bangladesh-could-consider-joining-mecca-pact-test-foreign-ties-2026-08-25/?utm_source=chatgpt.com) অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশ তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে ‘মক্কা চুক্তি’-তে যোগ দেওয়ার জন্য সৌদি আরব আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে কখন এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা জানা যায়নি।
চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি এই চুক্তিতে কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
তুরস্ক জানিয়েছে, চুক্তিটি ভবিষ্যতে আরও দেশকে যুক্ত করে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি। পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক।
মধ্যপ্রাচ্যে যখন আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে, তখন এই প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ইরান থেকেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর ঘটনা ঘটছে।
## পররাষ্ট্রনীতির বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে দেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরীক্ষা আসতে পারে। বাংলাদেশ সাধারণত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বিনিয়োগ, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তাৎক্ষণিকভাবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা না থাকলেও কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশ কোন পক্ষের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছে—এমন প্রশ্ন এড়ানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
## ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন জটিলতার আশঙ্কা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় সৌদি আরবের এই আমন্ত্রণ এসেছে। একই সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও সংবেদনশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি, বাংলাদেশি নাগরিকদের জোর করে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে।
এ অবস্থায় পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশ যোগ দিলে ভারত বিষয়টিকে কীভাবে নেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মক্কা চুক্তির বিষয়ে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য সিদ্ধান্তটি শুধু কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স ও আঞ্চলিক বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়নের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
তবে তিনি মনে করেন, শুধু অন্য দেশ কী ভাববে সেটিকে সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ না করে বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।