হাসপাতালের দূরত্ব ছিল মাত্র দুই মিনিটের পথ। কিন্তু তীব্র যানজট, অবৈধ পার্কিং ও বিশৃঙ্খল যান চলাচলের কারণে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে সড়কেই সন্তান প্রসব করেছেন সাভারের গৃহবধূ মোছা. রাজিয়া খাতুন (৩২)। পরে স্বামী আমীর হামজার সহায়তার আকুতি শুনে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মা ও নবজাতককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
রোববার (২ আগস্ট) সন্ধ্যায় সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকার সিটি সেন্টারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে রাজিয়া খাতুন শঙ্কামুক্ত থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই মাস আগে জন্ম নেওয়ায় নবজাতককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
পোশাকশ্রমিক আমীর হামজা জানান, সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য সময় আরও প্রায় দুই মাস বাকি থাকায় হঠাৎ এমন পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। রোববার দুপুরে কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় স্ত্রী তাকে ফোন করে প্রচণ্ড পেটব্যথার কথা জানান। ছুটি নিয়ে বাসায় ফিরতে কিছুটা দেরি হওয়ায় বিকেল ৫টার দিকে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে রিকশায় সাভারের শিমুলতলার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
পরে কাছের হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তীব্র যানজটে আটকে পড়ে তাদের রিকশা। আমীর হামজা বলেন, হাসপাতালটি মাত্র দুই মিনিটের দূরত্বে হলেও যানজটের কারণে ১০ থেকে ১৫ মিনিট আটকে থাকতে হয়। এ সময় স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে।
উপায়ান্তর না দেখে স্ত্রীকে কাঁধে করে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কয়েক কদম এগোতেই প্রচণ্ড প্রসববেদনার মধ্যে সড়কের ওপরই সন্তান প্রসব করেন রাজিয়া। সন্তান জন্মের পরপরই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
পরে আমীর হামজা স্থানীয় সুপার মেডিক্যাল হাসপাতালে গিয়ে বিষয়টি জানালে হাসপাতালের কর্মীরা দ্রুত স্ট্রেচার নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মা ও নবজাতককে উদ্ধার করেন। পরে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মো. আসিফ হামজা জানান, হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকেরা রাজিয়ার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি প্লাসেন্টা অপসারণ করেন। বর্তমানে মা সুস্থ আছেন। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেওয়ায় নবজাতককে এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের আরেক ব্যবস্থাপক মো. হুমায়ন কবির বলেন, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সার্ভিস লেনে অবৈধ দোকানপাট, পার্কিং, উল্টোপথে যান চলাচল ও নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে জরুরি রোগী বহনকারী যানবাহনও প্রায়ই আটকে পড়ে। মাত্র দুই মিনিটের পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় ১৫ থেকে ২০ মিনিট বা তারও বেশি সময় লাগে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকার সার্ভিস লেন ও ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে হকারদের অস্থায়ী দোকান রয়েছে। অনেক জায়গায় দোকানপাট ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের অংশও দখল করে রেখেছে। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করছেন, এতে যানবাহনের গতি আরও ধীর হয়ে পড়ছে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ ফুটপাত উচ্ছেদ ও যানজট নিরসনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরপরও যত্রতত্র পার্কিং ও অটোরিকশার কারণে মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছে। তিনি জানান, মা বর্তমানে সুস্থ থাকলেও নবজাতককে এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
ঢাকা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন জানান, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে এবং অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সড়কে সন্তান প্রসবের ঘটনা জানার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে ট্রাফিক বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।