নেপালের ত্রিশুলি উপত্যকায় ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার পর ভূগর্ভস্থ একটি সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে নয় দিন অন্ধকারের মধ্যে বেঁচে ছিলেন দুই কর্মী। খাবার ছাড়াই শুধু ঘোলা পানি পান করে তারা কাটিয়েছেন একের পর এক দুর্বিষহ দিন। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা তাদের জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান।
গত আগস্টের শেষ দিকে ত্রিশুলি উপত্যকায় হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। প্রবল পানির স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ওই দুর্যোগে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
বন্যার সময় আপার ত্রিশুলি থ্রি-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ অংশে কর্মরত ছিলেন কবির মহারজন ও সঞ্জয় সাহ। কাজ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড় থেকে কাদা ও পানির বিশাল স্রোত নেমে আসে। এতে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ভূগর্ভস্থ স্টেশন কাদাপানিতে ডুবে যায়।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে প্রাণ বাঁচাতে দুজন সুড়ঙ্গের আরও ভেতরের দিকে চলে যান। সেখানে তারা একটি অপেক্ষাকৃত ছোট ও ওপরের দিকে ঢালু কেবল-ডাক্ট টানেলে আশ্রয় নেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুড়ঙ্গের নির্গমনপথ থেকে প্রায় ১৬০ মিটার দূরের ওই অংশে পানি পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। ফলে সেখানে বাতাস থাকার মতো একটি ছোট জায়গা তৈরি হয়। এই ‘এয়ার পকেট’ই শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন বাঁচানোর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে নিরাপদ ওই জায়গাটিই নয় দিন ধরে তাদের জন্য এক ধরনের বন্দিশালায় পরিণত হয়। চারদিকে ছিল ঘন অন্ধকার ও কাদাপানি। কাছে কোনো খাবার ছিল না। তৃষ্ণা মেটাতে বাধ্য হয়ে ঘোলা কাদাপানি পান করতেন কবির। আর মানসিকভাবে শক্ত থাকার জন্য অন্ধকারের মধ্যে হিন্দু মন্ত্র পাঠ করতেন সঞ্জয়।
এভাবেই খাবার ছাড়াই শুধু কাদামিশ্রিত পানি পান করে এবং প্রচণ্ড মানসিক শক্তি ধরে রেখে নয়টি দিন পার করেন তারা।
এদিকে তাদের উদ্ধারে বাইরে থেকে সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় প্রকৌশলীরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিলেন। টানা বৃষ্টি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে সুড়ঙ্গের ভেতরে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত বিশেষ ওয়াটার জেট ব্যবহার করে কাদা সরানো হয়। পাশাপাশি সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস পৌঁছানোর জন্য ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে পথ তৈরি করা হয়। দশম দিনে উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে জীবিত মানুষের অস্তিত্বের সন্ধান পান।
উদ্ধারকারীরা প্রথমে অন্ধকারের মধ্যে সামান্য আলো দেখতে পান। এরপর একটি হাত দেখা গেলে নিশ্চিত হন, ভেতরে এখনো মানুষ জীবিত আছেন।
দীর্ঘ নয় দিন পর কবির ও সঞ্জয়কে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অনাহার ও প্রতিকূল পরিবেশে থাকার কারণে তারা তখন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। কয়েক দিনের চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে তাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়।
ভয়াবহ সেই দুর্যোগে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির মধ্যেও সুড়ঙ্গের ক্ষুদ্র ‘এয়ার পকেট’-এর কারণে দুই কর্মীর নয় দিন বেঁচে থাকার ঘটনা এখন নেপালে বেঁচে থাকার এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।