তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরের সিংগীজানী গ্রামের ১৩০টি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত দুই দিন ধরে গৃহহারা পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউ হাঁটুসমান পানির মধ্যে চকি কিংবা টংয়ের ওপর পলিথিন ও টিনের ছাউনি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। থাকার জায়গা, খাবার ও নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন এসব পরিবার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভয়াবহ ভাঙনের পরও এখন পর্যন্ত গৃহহারা পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে পরিবারগুলো অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। স্বজন ও শিশুদের নিয়ে কোথায় থাকবেন, কীভাবে খাবার জোগাড় করবেন, তা নিয়ে দিশেহারা তারা।
শুক্রবার বিকেলে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান। এ সময় সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি এবং কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ পরিবারের মধ্যে ৩০ পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল এবং ৭০ পরিবারকে শুকনা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়।
গত দুই দিনের ভয়াবহ ভাঙনে শুধু বসতঘরই নয়, গাছপালা, রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় দেড় শতাধিক একর ফসলি জমি তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কারণে ওই এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
শুক্রবার চরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলার কারণে ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমলেও নদীভাঙন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতা ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে বারবার ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. হাফিজার রহমান বলেন, ভাঙনের খবর দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিরা ভাঙনকবলিত এলাকায় আসেন। খবর না দিলে তাদের দেখা পাওয়া যায় না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে আরও দুই শতাধিক বসতবাড়ি, শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালা ও রাস্তাঘাট ভাঙনের মুখে রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপরও এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়টির ভ্রাম্যমাণ বা বিকল্পভাবে পাঠদান কার্যক্রম চালু করা হয়নি। এতে চরের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ রয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, শুক্রবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এই মুহূর্তে ত্রাণ বিতরণ ছাড়া অন্য কোনো সহায়তা করার সুযোগ নেই।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, জিও ব্যাগ ফেলার কারণে ভাঙনের গতি অনেকটা কমে গেছে। তবে স্থায়ী ব্যবস্থা না করলে নদীভাঙন অব্যাহত থাকবে। নদীভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব, জিও ব্যাগ ফেলা এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে তথ্য প্রদান ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। নদী খনন, ড্রেজিং, নদীশাসন এবং গতিপথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তিস্তার ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, অল্প সময়ের মধ্যে বরাদ্দ পাওয়া যাবে।
তিস্তায় ভাঙন অব্যাহত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আরও বহু পরিবার বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।