হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে সভা ত্যাগ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। এ ঘটনায় বিব্রত ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতির মধ্যে কোনো বিভাজন কাম্য নয়। দেশের মানুষ আর ফ্যাসিবাদের রাজনীতি হতে দেবে না উল্লেখ করে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
শহীদদের রক্তের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশকে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা তো আওয়ামী লীগ হতে পারব না, হতেও চাই না। তাদের দেখেন, কোনো অনুশোচনা নাই।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রসঙ্গে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের এই সরকারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জুলাইতে যারা আত্মাহুতি দিয়েছে, সেইসব পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করা। যারা আহত, চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে, অঙ্গ হারিয়েছে, তাদের সুস্থ করে তোলা এই সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা জীবন দিয়ে গেছে ১৯৭১ সালে, তারাও কিছু পায় নাই। আপনারাও হয়তো যা প্রাপ্য তা পাবেন না, কিন্তু এই সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়ই সম্মান পাবেন। গরিব দেশের যতটুকু সাধ্য আছে, সবকিছু উজাড় করে দেবো আপনাদের কল্যাণের জন্যে।’
গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৭১-এর জনযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। একইভাবে জুলাইয়ের এই যুদ্ধও ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে। কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, আমরা কি নির্বাচনের জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছি নাকি? নির্বাচন তো গণতন্ত্রের অনুষঙ্গ।’
তিনি বলেন, ‘এই দেশে যতদিন গণতন্ত্র থাকবে, সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, ততদিনই আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে। সুতরাং গণতন্ত্র কোনো হেলাফেলার জিনিস নয়।’
প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে ক্ষোভ
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে এনসিপি নেতারা সভা ত্যাগ করেন। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ও বিব্রতবোধের কথা জানান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এখানে ডকুমেন্টারিতে অনেক ভুল আছে। প্রথম ভুল আমি যেখানে দেখেছি, সেখানে তো আবু সাঈদের ছবিই নাই। আবু সাঈদ এই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, প্রতীক। তার ছবি না থাকলে এটা কোনো ডকুমেন্টারি হলো না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে আরও নাই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও তো নেই।’
প্রামাণ্যচিত্রের ভুলের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ক্ষমা চাওয়ার পর সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কিছু ভুল হয়েছে এবং এই ভুল মাননীয় মন্ত্রী জোড়হাতে স্বীকার করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন, বারবার ক্ষমা চেয়েছেন। তারপর তো শান্ত হওয়া উচিত। এ ধরনের একটা জাতীয় অনুষ্ঠানে এটাকে পুষে সংসদের মতো একটা ওয়াকআউট, এটি বাঞ্ছনীয় নয়।’
আখতার হোসেন তার অনুসারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমি লক্ষ্য করেছি মাননীয় সংসদ সদস্য আখতার, তিনি তার অনুসারীদের প্রশমিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে নেতাকে তো মানে না সহজে অনুসারীরা। প্রতি মুহূর্তেই তারা যে নেতার চেয়ে বড়, এটা প্রমাণ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় অনুষ্ঠানে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা মোটেই কাম্য ছিল না।’
### জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের যাত্রাপথ সহজ নয়। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।’
তিনি বলেন, কোনো বিভাজন বা সংকীর্ণ স্বার্থ যেন জাতীয় অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচার করা হবে এবং আদালতই ঠিক করবে দলটির পরিণতি কী হবে।
গণহত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গণহত্যাকারীদের এ দেশে রাজনীতি করতে দেবে না।