মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর অনুরোধে ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার (১৮ মে) এ ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসঙ্গে তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক ইস্যুতে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে, তবে আলোচনা এখনো জটিল অবস্থায় রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের অনুরোধে তিনি সামরিক পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। তার দাবি, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলার হুমকি দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারত।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চললেও স্থায়ী শান্তিচুক্তি এখনো হয়নি। এর মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন হামলা ও সামরিক উত্তেজনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রধান বিরোধের ইস্যুগুলো
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। ওয়াশিংটন চাইছে তেহরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তর করুক বা দীর্ঘ সময়ের জন্য সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখুক। তবে ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বিষয়টিকে তাদের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে দেখছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা কখনো প্রকাশ করেনি, তবে এই মজুদ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে।
২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) চুক্তির অধীনে ইরানকে সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আরেকটি বড় বিরোধের বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রণালিতে ইরানের কড়াকড়ি এবং কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ইরান কিছু ক্ষেত্রে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
শান্তি আলোচনা ও অনিশ্চয়তা
ইরান জানিয়েছে, তারা সংশোধিত একটি ১৪ দফা শান্তিপ্রস্তাব মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছে। তবে এর নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। প্রস্তাবে বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক উত্তেজনা হ্রাসের দাবি রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে দুই পক্ষই একে অপরের শর্ত নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়ায় আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি—এই দুই ইস্যুই এখনো প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি এখনও অনিশ্চিত।
মন্তব্য করুন