বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) চার আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস।
রোববার (০২ আগস্ট) রাতে থেকে সোমবার (০৩ আগস্ট) দিবাগত মধ্যরাত পর্যন্ত পৃথক দুই ঘটনায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী হল, আশরাফুল হক হল ও শহীদ শামসুল হক - এই চার আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হামলা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার (০৩ আগস্ট) বাকৃবির ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক বলেন, সংঘর্ষের ঘটনাগুলো তদন্তসাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটিগুলো ঘটনাগুলোর সঙ্গে কারা জড়িত তা তদন্ত করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেই হোক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি এবং আহতদের চিকিৎসাসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে একটি সভা শেষ করেছি এবং আশা করছি খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সোহরাওয়ার্দী হল ও আশরাফুল হক হলের মধ্যকার ঘটনায় একটি এবং শামসুল হক হল ও আশরাফুল হক হলের মধ্যকার ঘটনায় আরেকটি কমিটি কাজ করবে। এই দুই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়েও আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি। আশা করছি, আজকের মধ্যেই এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় প্রথমে রাত সাড়ে নয়টায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল ও মাওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। এরপর প্রক্টরিয়াল টিমের উপস্থিতিতে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঝামেলার মিমাংসা হয়। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই রাত প্রায় ১২টার সময় বাকৃবির ফসিলের মোড় এলাকায় এক চায়ের দোকান থেকে আশরাফুল হক হল ও শামসুল হক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে বক্তব্য দেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানোয় তাদের নাম প্রকাশ করা হয় নি।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল সূত্রে জানা যায়, রোববার রাতে আব্দুল জব্বার মোড় এলাকায় সোহরাওয়ার্দী হলের এক শিক্ষার্থীকে পেয়ে মাওলানা ভাসানী হলের ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, আমি জব্বার মোড় দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন আমাকে পেছন থেকে টেনে ধরে। আমি জিজ্ঞেস করি, 'কী হয়েছে?' তখন তারা আমাকে উসকানিমূলক কথা বলতে শুরু করে। এরপর তারা আমাকে মারধর করে। তারা এমনভাবে মারছিল যে আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বাঁচব না। কোনো রকমে সেখান থেকে পালিয়ে এসে প্রাণে বাঁচি। তারা আমার চশমা ভেঙে ফেলে এবং মানিব্যাগও নিয়ে যায়। এর আগে একটি হোটেলে গিয়ে খাবার সময় হামলাকারীদের কয়েকজনক আমাকে শনাক্ত করতে দেখেছি।
ঘটনার পর পরই সোহরাওয়ার্দী হলের শিক্ষার্থীরা বিচার দাবিতে একত্র হন। হলের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী মিজু বলেন, "আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আগের দিনের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজ আবার এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসন যদি এখনই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করে, তাহলে ভবিষ্যতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল থাকবে। আমরা চাই, প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।"
এই বিষয়ে মাওলানা ভাসানী হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ করা হলে সেখানেও নাম না প্রকাশের শর্তে তিনি বলেন, ওরা যা করছে সেটি অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এটার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। গত রাতে যা হয়েছে এই মারামারিতে উভয়পক্ষেরই দায় আছে।
অন্যদিকে একই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসিল মোড় এলাকায় শামসুল হক হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় চায়ের দোকানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। পরে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। উভয় পক্ষের শিক্ষার্থীরা অন্য হলের গেট এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশরাফুল হক হলের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, আমরা ব্যাচমেট ও জুনিয়রসহ সাতজন শিক্ষার্থী ফসিল এলাকায় চায়ের দোকানে বসে থাকাকালে শামসুল হক হলের প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী অতর্কিত হামলা চালিয়ে গ্লাস, কাপ ও বেঞ্চ দিয়ে মারধর করেন। হামলাকারীরা আমাদের গালিগালাজ করে শামসুল হক হলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করে।
অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শামসুল হক হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, পূর্ববর্তী বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যেই উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ফসিল এলাকায় হাতাহাতির পর ভুল তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশরাফুল হক হলের শিক্ষার্থীরা শামসুল হক হলের গেটে গিয়ে ভাঙচুর চালান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, আজ মাননীয় উপাচার্যের নেতৃত্বে প্রোভোস্ট কাউন্সিল, প্রক্টোরিয়াল বডি ও অ্যাডভাইজরি বডির সদস্যদের নিয়ে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন হল থেকে পাওয়া কাগজপত্র, আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে যারা দোষী বলে প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অর্ডিন্যান্স রয়েছে এবং সেই অর্ডিন্যান্স অনুসারেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রথম বর্ষের দুই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে আশরাফুল হক হল ও শামসুল হক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় অন্তত ১৩ জন শিক্ষার্থী আহত হন। আবার শনিবার রাতে অনলাইনে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় চারজন শিক্ষার্থী আহত হন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারটি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।