আজ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াটা ছিল একটু ভিন্ন। হালকা শীতের পরশ, কিছুক্ষণ বৃষ্টি, আবার পরপরই মেঘ চিরে রোদের উঁকি। প্রতিদিনের মতো ক্যাম্পাস জুড়ে ছিল হাজারো শিক্ষার্থীর কর্মচাঞ্চল্য। কেউ যাচ্ছিলেন ক্লাসে, কেউ ক্যাফেটেরিয়া, কেউবা দোকানের বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন, আবার কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অপেক্ষা করছিলেন প্রিয় বন্ধুর জন্য। এমনই এক শান্ত ও মুখরিত পরিবেশে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে হঠাৎ ঘনিয়ে এলো এক ট্র্যাজেডি। শিক্ষার্থীদের পরিবহনে ব্যবহৃত লাল রঙের বিআরটিসি বাসের ভারি চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যায় ক্যাম্পাসেরই চেনা এক অবুঝ পথকুকুর।
মুহূর্তের মধ্যে রাজপথের ধূসর কংক্রিট ভিজে গেল লাল রক্তে। কিন্তু দুর্ঘটনার তীব্রতার চেয়েও বেশি বুকভাঙা হয়ে উঠল তার ঠিক পরের দৃশ্যটি। রক্তাক্ত নিথর দেহটার পাশে হঠাৎ এসে দাঁড়াল তার পরম বন্ধু অন্য একটি পথকুকুর।
মানব সমাজকে যেন এক পরম শিক্ষা দিয়ে গেল কুকুরটি –বিপদে বন্ধুকে কখনো ছেড়ে যেতে নেই। তার চোখে ছিল না কোনো রাগ, শুধু ছিল এক বুক অবোধ বিস্ময় আর হাহাকার। রক্তে ভেজা বন্ধুটির মুখের কাছে মুখ নিয়ে সে বারবার ঘ্রাণ নিচ্ছিল, আলতো করে স্পর্শ করছিল, যেন বলছিল–"একটু ওঠ না, চল আগের মতো আবার একসাথে ক্যাম্পাসের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে বেড়াই।"
মানুষের মতো মুখের ভাষা হয়তো ওর নেই, কিন্তু সেই নীরব আকুতি ও শূন্য দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের বুক কেঁপে উঠেছিল। ক্যাম্পাসের চেনা মেঠো পথ আর গাছের ছায়াগুলো যেন এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই প্রাণগুলো কেবল চারপায়ে কোনো জীব ছিল না; তারা ছিল শিক্ষার্থীদের ক্লান্তিভরা বিকেলের নীরব সঙ্গী, কোনো প্রতিবাদ ছাড়া ভালোবেসে যাওয়া ক্যাম্পাসের একাকিত্বের নিঃশব্দ সমব্যথী।
রাজপথ থেকে রক্তের দাগ হয়তো বর্ষার জলে ধুয়ে যাবে, কিন্তু নিঃসঙ্গ সঙ্গীটির সেই করুণ চাউনি আর ব্যাকুল অপেক্ষা ক্যাম্পাসের বাতাসে চিরতরে এক গভীর বিষাদের ক্ষত রেখে গেল।
ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা কেউ বলছেন, “আজ একটি কুকুর মরেছে, কাল হয়তো একজন মানুষ মারা যাবে।” তাদের অভিযোগ, যাতায়াতের সময় অনেক বাসচালকই বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী শাহারিয়ার আহমেদ রামিম মন্তব্য করেন, “ঘটনার সময় আমি সেখানে ছিলাম। কুকুরটি বাসের নিচে পড়ে যাওয়ার পরও চালক গাড়ির গতি থামাননি। কুকুরটি বড় করে চিৎকার করছিল এবং ঘটনাস্থলেই মারা যায়।”
কুকুরগুলোর পারস্পরিক সখ্যের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি কুকুরগুলোকে চিনি। তিনটি কুকুর সবসময় একসঙ্গে থাকত। তারা একসঙ্গে ঘোরাফেরা ও খেলাধুলা করত।”
আরেক শিক্ষার্থী ওয়াকিল আহমেদ বলেন, “ক্যাম্পাস থেকে আস্তে-ধীরে গাড়ি বের না করে চালক বেপরোয়া গতিতে বের হন, এটা সবাই দেখে। চালককে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।“
ক্যাম্পাসের ব্যস্ত প্রধান ফটক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ও যানবাহন যাতায়াত করে। সেই ব্যস্ততার মাঝেই পড়ে রইল একটি প্রাণের নিথর দেহ। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সঙ্গীটি যেন নির্বাক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে গেল– যে সঙ্গীটি প্রতিদিন পাশে ছিল, সে কেন আজ আর ফিরছে না?