জাতীয় নির্বাচনের আর খুব বেশি দিন দেরি নেই। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলগুলো নানারকম কর্মসূচি পালন করছে। সভা-সমাবেশ, মিছিল-বিক্ষোভসহ নানা ইস্যুতে ব্যাপক মনোযোগী পুলিশ ও র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঠিক সেই সুযোগে পাশের দেশের সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্রের চোরাচালান ও মরণনেশা ইয়াবা। মাদক ও অস্ত্রের চোরাকারবারিরা সুযোগ বুঝে আরও বেশি তৎপরতা শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। সম্প্রতি মিয়ানমার সীমান্তের কক্সবাজার অঞ্চল দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালান এসেছে এবং বেশ কয়েকটি চালান আটকও হয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের আরও কিছু সীমান্ত এলাকা দিয়ে একাধিক অস্ত্রের চালান প্রবেশের খবর জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজধানীসহ সারা দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। শীর্ষসন্ত্রাসী, রাজনৈতিক দলের ক্যাডার এবং জঙ্গি থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার ছিঁচকে মাস্তানদের হাতেও দেখা যাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। নিয়মিত অভিযানে মাঝে মধ্যেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়েও আসছে অত্যাধুনিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। তবে বেশি আসছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক সীমান্ত এলাকা দিয়ে। আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার বড় বড় চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কয়েকটি অভিযানেও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা আটক হয়েছে। নানা কৌশলে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র-মাদক প্রবেশ করিয়ে সেগুলো ঢাকাসহ চাহিদা মোতাবেক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারা দেশে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত শুধু র্যাবের অভিযানেই ৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ২০টি বিদেশি পিস্তল। এ ছাড়া পুলিশের অভিযানেও ১৫টি অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছে অন্তত ২২ জন। অন্যান্য সংস্থার অভিযানেও একাধিক অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে এলে রাজনৈতিক সংঘাত বা উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়-দায়িত্ব ও ডিউটি অনেকগুণ বেড়ে যায়। পরিস্থিতি শান্ত রাখার পাশাপাশি রাজনীতির দিকেই বেশি মনোযোগ থাকে। আর সে সুযোগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে, ভোটের মাঠ নিজের দখলে রাখতে অনেক সময় প্রার্থীরা বা নেতারা পেশাদার অপরাধীদের কাজে লাগিয়ে থাকেন। অনেক সময় অবৈধ অস্ত্রের মজুদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা ঘটে। হয়তো সে ধরনের অপতৎপরতা শুরুও হয়েছে। এ কারণে আগে আগেই এ ধরনের অপরাধ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে নির্বাচনি মাঠ কিছুটা হলেও শান্তিপূর্ণ থাকবে। পাশাপাশি এই সময়ে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচি সামলানোর পাশাপাশি পেছনের অপকর্মগুলো ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সোচ্চার হতে হবে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে নানা ধরনের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এ জন্য নির্বাচনের আগে একটা বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে। যারা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, যারা নির্বাচনে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, ভোটকেন্দ্র দখল করতে পারে, কোনো নেতা বা প্রার্থীর পক্ষে ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে ভোটকেন্দ্রে সমস্যা করতে পারে-এই ধরনের অপরাধীদের একটি তালিকা হয়ে থাকে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এবং অতীত রেকর্ডের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি হয়। নতুন কিছু নামও আসে। তখন পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবি সবাই মিলে নির্বাচনের আগে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তিন পর্যায়ে পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বাচন-পূর্ববর্তী একটা পদক্ষেপ থাকে, নির্বাচনের দিনে এক ধরনের পদক্ষেপ থাকে এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ঠেকাতে আরেক ধরনের পদক্ষেপ থাকে। এটা সবসময় হয়ে থাকে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে অপরাধীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (অপারেশন্স) মো. আনোয়ার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়ে থাকে। সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলছে। তফসিল ঘোষণার পর এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু হবে। তবে পুলিশ সারা দেশেই অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে।
জানা যায়, গত ২৫ আগস্ট রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তার এক সপ্তাহ আগে ১৮ আগস্ট রাজশাহীর পুঠিয়ায় বাদাম বিক্রির ছদ্মবেশে অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার অভিযোগে চারটি ওয়ান শুটারগান ও ছয় রাউন্ড গুলিসহ একজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। ওই সময় র্যাব জানিয়েছিল, নির্বাচনকে সামনে রেখে চোরাইপথে দেশি-বিদেশি অবৈধ অস্ত্রের চালান ঢুকছে রাজশাহীতে। অন্যদিকে গত ২০ আগস্ট রাজধানীর লালবাগ এলাকা থেকে তিনটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩৭ রাউন্ড গুলিসহ ছাত্রদলের ছয় নেতাকে গ্রেফতার করে ডিবি।
এ সময় ডিবি জানায়, নির্বাচনের আগে দেশে নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন তারা। গত ২৫ জুলাই বগুড়ার স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতিকে দুটি বিদেশি অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের শ্রীপুরে বিএনপির পদযাত্রায় পিস্তল উঁচিয়ে মিছিল করা জাহিদুল হাসানকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা সবাই নির্বাচনের আগে নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন বলে জানিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এ ছাড়াও গত ৮ মে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে দুটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন এবং ৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মতিঝিল সার্কেল। গত ৬ মে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব। চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির ফটিকছড়ি থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে সেনাবাহিনী। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪টি মর্টার, ১টি একে ৪৭ রাইফেল, ১টি এম ওয়ান রাইফেল, ১টি একে-২২ রাইফেল, ১টি চীনা পিস্তল, ১টি এলজি লং ব্যারেল রাইফেল, ১টি এলজি শর্ট ব্যারেল রাইফেল, ২টি ওয়াকিটকি, মাইন তৈরির সরঞ্জাম, গোলাবারুদ, বিপুল পরিমাণ আইইডি সরঞ্জাম এবং ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে গত ২৪ আগস্ট টেকনাফের হ্নীলা সীমান্ত থেকে ৮০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এর দুদিন আগে ২২ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত এলাকা থেকে বিজিবি অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, এক রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে। গত ১৯ আগস্ট কক্সবাজার থেকে ৯৭ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। গত ১৬ আগস্ট টেকনাফ থেকে সাড়ে পাঁচ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস ও পাঁচ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। গত ১২ ও ১৩ আগস্ট টেকনাফ থেকে আরও ৯০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
সুত্র সময়ের আলো
মন্তব্য করুন