ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সারাদেশ এখন ভোটের অপেক্ষায়। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী উপকরণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ভোটের পরিবেশ কেমন থাকবে, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি। ভোটের হাওয়া কোন দিকে বইছে তা নিয়ে সর্বত্র টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যানবাহন স্টেশন ও রেস্টুরেন্টসহ সর্বত্রই এখন একটাই আলোচনা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে তো। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এটি এখন কার্যত ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় সারাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের জমজমাট নির্বাচনী প্রচার শেষ হয়েছে। রাত পোহালেই বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একযোগে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। ভিন্ন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন হওয়ায় এবারের ভোট নিয়ে দেশের মানুষের পাশাপাশি বিদেশের বিভিন্ন মহলেও প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। মোট ২ হাজার ৪ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রায় পৌনে তিনশ’ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
প্রার্থীরা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। পাড়া-মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাসিমুখে ভোট প্রার্থনা করেছেন, মা-বোন ও মুরব্বিদের দোয়া নিয়েছেন। ২২ জানুয়ারি শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচার শেষ হয় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায়। বড় রাজনৈতিক দলগুলো দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে ভোটের প্রস্তুতি জোরদার করেছে। একই সঙ্গে দলের বাইরের যেসব ব্যক্তি ভোটের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে পোলিং এজেন্টদের ভোটের দিন সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের বাইরে দলের স্বেচ্ছাসেবকদের জন্যও দেওয়া হয়েছে বিস্তারিত নির্দেশনা। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নিজেদের মতো করে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন।
১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৎপরতা শুরু হয়। ২১ জানুয়ারি প্রতীক পাওয়ার পর প্রার্থীরা সরাসরি ভোটের মাঠে নামেন। তাদের সঙ্গে দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও স্বজনরাও প্রকাশ্যে মাঠে সক্রিয় হন। অনেক প্রার্থী বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে শোডাউন করে নিয়মিত গণসংযোগ করেছেন। অলি-গলি ও রাজপথ ভরে ওঠে প্রার্থীদের ছবি ও প্রতীক সংবলিত ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও বিলবোর্ডে। তবে এবারই প্রথম প্রার্থীদের পোস্টার ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি।
বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও সারাদেশে জনসভা করে ভোট প্রার্থনা করেছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজধানীতে ১৬টিসহ সারাদেশে মোট ৪৪টি জনসভা করেন। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ৪৮টি জেলায় জনসভা করে দলের পক্ষে ভোট চান। অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতারাও একইভাবে দেশজুড়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। প্রার্থীরা নিজেদের অনুসারী ও স্বজনদের নিয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, সভা-সমাবেশ, মিছিল ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত টানা প্রচার চালান। ভোটের সার্বিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় সারাদেশে উৎসবমুখর আবহ বিরাজ করছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজ নিজ এলাকায় ভোট দিতে গ্রামে ছুটে যাচ্ছেন, যা আগের তিনটি জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন চিত্র।
নির্বাচন কমিশন এবার সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করেছে। আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি চলছে। প্রতিটি এলাকায় দায়িত্বরত ইসি কর্মকর্তা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে তৎপর থাকায় অনেক প্রার্থীকে শোকজ নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও প্রাথমিক বাছাই, আপিল ও উচ্চ আদালতের রায়ের পর চূড়ান্ত লড়াইয়ে ৩০০ আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ বাদে ২৯৯ আসনে ২ হাজার ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন। বিএনপির ২৯১ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন, জাতীয় পার্টির ১৯৮ জন এবং এনসিপির ৩২ জন প্রার্থী রয়েছে।
সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনসহ অন্য কমিশনাররা বিভিন্ন জেলায় গিয়ে প্রার্থী, রাজনৈতিক দলের নেতা, প্রশাসন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। আচরণবিধি প্রয়োগের অংশ হিসেবে সারাদেশে ৪৬১টি ঘটনায় ২৫৯টি মামলা হয়েছে এবং ৩ কোটি ২১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিজিবি ও আনসার মাঠে রয়েছে এবং তারা ভোটের পরও তিন দিন দায়িত্ব পালন করবে। সেনাবাহিনীও নিয়োজিত রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বয়ে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিজিবি যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সারাদেশে প্রায় ৯ লাখ সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকছেন ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন এবং ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক।
সারাদেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী উপকরণ আজকের মধ্যেই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ইতোমধ্যেই অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২২০ জন। নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণের জন্য ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রায় ১০ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করবেন। ভোট গ্রহণ শুরু হবে সকাল সাড়ে ৭টায় এবং চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে। একই সঙ্গে সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনের পরিবেশ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো। তফসিল ঘোষণার পর থেকে সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলনামূলকভাবে কম। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় থাকায় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কঠোরভাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করে যাবে বলে তিনি জানান। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে ৪৮ ঘণ্টার জন্য বহিরাগতদের নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান ও যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সারাদেশের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও পুলিশ কমিশনারদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন