শেষ সম্বল পাখি ভ্যানটিও চুরি, প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে অনাহারে বৃদ্ধ বাবার কান্না

দে
আল-আমিন হোসেন
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২১
শেষ সম্বল পাখি ভ্যানটিও চুরি, প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে অনাহারে বৃদ্ধ বাবার কান্না


বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। পাশে প্রতিবন্ধী ছেলে। সংসারে নেই সচ্ছলতা, নেই সঞ্চয়। তবু পেটের দায়ে প্রতিদিন পাখি ভ্যান নিয়ে বের হতেন আসাদুল হক। দিন শেষে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত দুজনের খাবার ও প্রতিবন্ধী ছেলের ওষুধ।


সেই ভ্যানটিই এখন নেই।


গত ১৩ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১২টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি গ্রামে বাড়ির উঠান থেকে চুরি হয়ে যায় তাঁর পাখি ভ্যান। ভ্যানটি হারানোর পর থেকে আয় বন্ধ। ঘরে খাবারের সংকট। প্রতিবন্ধী ছেলের ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই।


কান্নাজড়িত কণ্ঠে আসাদুল বলেন, ‘আমরা গরিব বলে আমাদের দেখার কেউ নেই। বিষ কেনার টাকা থাকলেও খেয়ে ওপারে চলে যেতাম। কিন্তু আমার প্রতিবন্ধী ছেলেটাকে রেখে কীভাবে যাব?’কথাগুলো বলার সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি।


ভ্যানটি ছিল তাঁর কাছে শুধু একটি যানবাহন নয়, ছিল বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। ভ্যান চালিয়ে যে টাকা পেতেন, সেটিই ছিল পরিবারের খাবার ও ছেলের চিকিৎসার ভরসা। সেই অবলম্বনটুকু চুরি হয়ে যাওয়ার পর এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।


আসাদুল জানান, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে এসে তাঁর পাখি ভ্যানটি নিয়ে যায়। দিনের বেলায় বাড়ির উঠান থেকে ভ্যান চুরি হওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেন তিনি। পরে পরদিন আলমডাঙ্গা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।


ভ্যান ফিরে পাওয়ার আশায় থানার সামনে বসেও অপেক্ষা করেছেন তিনি। মনে ছিল ক্ষীণ একটি আশা—হয়তো পুলিশ তাঁর জীবনের একমাত্র অবলম্বনটি উদ্ধার করে দেবে। কিন্তু অভিযোগের ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও ভ্যানটির সন্ধান মেলেনি।


আসাদুল বলেন, ‘রাতে ভ্যানটা চুরি হলে হয়তো নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। কিন্তু দিনের বেলায় বাড়ির উঠান থেকে নিয়ে গেল। আমি নিজের ভাগ্যকেই দোষ দিই।’


এরপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বলেন, ‘এই ভ্যানটা হারিয়ে আমি শুধু একটা ভ্যান হারাইনি। আমার ছেলের ওষুধের টাকা হারিয়েছি, স্বামী হিসাবে বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার পথ হারিয়েছি, সংসার চালানোর পথ হারিয়েছি। ভ্যান হারানোর পর থেকে কীভাবে দিন কাটছে, তা শুধু আমি আর আমার পরিবারই জানি। ক্ষুধার যন্ত্রণায় রাতে পেটে বালিশ চেপে ধরে ছটফট করে রাত পার করি। তবুও মনে একটা আশা, এই বুঝি আমার ভ্যানটা ফিরে পাব, আবার ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতে পারব, আমার প্রতিবন্ধী ছেলেটার মুখে খাবার তুলে দিতে পারব। সেই আশাতেই প্রতিদিন অপেক্ষা করছি।


 এদিকে ভ্যান চুরির ঘটনায় তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার বোধও। তাঁর প্রশ্ন—একজন সাধারণ নাগরিকের ঘরের উঠান থেকে দিনের বেলায় জীবিকার একমাত্র অবলম্বন চুরি হয়ে গেলে সে কোথায় নিরাপত্তা চাইবে?


আসাদুলের ভাষায়, ‘রাষ্ট্রের কাছে আমাদেরও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে। গরিব বলে কি আমাদের জীবন আর সম্পদের নিরাপত্তা থাকবে না? আমার মতো মানুষ যদি নিজের ঘরেও নিরাপদ না থাকে, তাহলে যাব কোথায়?’


আসাদুল বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩ হাজার টাকা আর কিছু খাবার পেয়েছিলাম। তাতে কয়েকদিন চলেছি। এখন সব শেষ। প্রতিদিন তো খাবার লাগে, ছেলের ওষুধ লাগে। ভ্যান না থাকলে আয় করব কীভাবে?’। পেটের ক্ষুধায় চুরি করতে হবে নয়তো নিজেই পৃথিবী ত্যাগ করতে হবে।


বৃদ্ধ এই বাবার সামনে এখন যেন দুটি পথ—একদিকে ক্ষুধা ও অসহায়ত্ব, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব । বয়সের ভারে নিজেই যখন অন্যের সহায়তা পাওয়ার কথা, তখন সেই তিনিই প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য উপার্জনের চেষ্টা করছিলেন। সেই শেষ চেষ্টার হাতিয়ারটিও এখন চুরি হয়ে গেছে।


এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনুর আক্তার বলেন, ‘ভ্যান চুরি হয়ে গেছে, এটা দুঃখজনক বিষয়। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে একটি ভ্যান দেওয়ার মতো তেমন কোনো অপশন নেই।’


স্থানীয়দের দাবি, শুধু এককালীন খাদ্য সহায়তা দিয়ে এই পরিবারের সমস্যার সমাধান হবে না। ভ্যানটি উদ্ধার করা সম্ভব হলে সেটি ফিরিয়ে দেওয়া, অথবা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান বা উপজেলা প্রশাসন এগিয়ে এসে একটি ভ্যানের ব্যবস্থা করলে আসাদুল আবারও কাজ করে নিজের ও প্রতিবন্ধী ছেলের খাবার-ওষুধের ব্যবস্থা করতে পারবেন।


বেলগাছির ছোট্ট বাড়িটিতে এখনো অপেক্ষা করেন আসাদুল। কখনো থানার দিকে তাকান, কখনো শূন্য উঠানের দিকে। এই বুঝি আমার হারানো ভ্যান ফিরিয়ে পেলাম।

সর্বশেষ সংবাদ

একই বিভাগের আরও সংবাদ

🏠 হোম জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক সারাবাংলা খেলাধুলা আইন আদালত বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি প্রবাস ধর্ম তথ্য ও প্রযুক্তি লাইফস্টাইল অপরাধ নারী ও শিশু রাজধানী অন্যান্য