চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকার একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট প্রায় দেড় মাস ধরে ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক। সেখানে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিপুলসংখ্যক তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম বসানো হয়েছিল। পুলিশের দাবি, এসব ডিভাইস ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণার একটি চক্র পরিচালনা করা হচ্ছিল।
বৃহস্পতিবার রাতে জালালাবাদ আবাসিক এলাকার ওই ভবনে যৌথ অভিযান চালিয়ে ৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করে নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা-পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মুঠোফোনসহ মোট ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে লাওসের ৩৪ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের পাঁচজন, নেপালের দুজন এবং ভিয়েতনামের একজন নাগরিক রয়েছেন।
পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কারও কাছে পাসপোর্ট বা ভিসা পাওয়া যায়নি। এসব নথি বাংলাদেশি একটি চক্রের সদস্যদের কাছে রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। ওই চক্রের সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশে এসে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ খুঁজছিলেন। দেশীয় একটি চক্রের সহযোগিতায় দেড় মাস আগে খুলশীর ভবনটি ভাড়া নেওয়া হয়। ভবনটির মালিক দুবাইপ্রবাসী বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ভবনের ১৪টি ইউনিটে তল্লাশি চালিয়ে অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকেরা বাংলাদেশে অন্য কোনো বৈধ কাজ করছিলেন—এমন প্রমাণও তাঁরা দেখাতে পারেননি বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
কীভাবে তাঁরা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন এবং কোন ধরনের ভিসায় এসেছেন, তা জানতে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অনলাইন প্রতারণা চক্রটির মাঠপর্যায়ের সদস্য। বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রতারণা এবং চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে কী পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কিংবা চক্রটির সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত নয়। উদ্ধার করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার পর প্রতারণার ধরন ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়েছে। খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম জানান, গ্রেপ্তার ৬৩ জনকে শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে দেশীয় চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে চীন ও তাইওয়ানের ছয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
খুলশীর ঘটনায় কক্সবাজারের ওই ঘটনার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মেদ।