শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব সংকটসহ নানা অব্যবস্থাপনায় সেশনজটে আটকে পড়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা চলমান থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বিভাগটিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে দ্রুত এসব সংকট নিরসনের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
বিভাগীয় প্রধান সূত্রে জানা যায়, বিভাগটিতে বর্তমানে মোট ৭টি ব্যাচ চলমান রয়েছে এবং একটি ব্যাচের ৯জন থিসিস শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া বিভাগে একজন পিএইচডি শিক্ষার্থীও রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৩০ জন।
বিপরীতে বিভাগে নিয়োজিত শিক্ষকের সংখ্যা রয়েছে ১৬ জন যার মধ্যে ৭ জন বর্তমানে শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন। ফলে নিয়মিতভাবে পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ৯ জন শিক্ষক। এ হিসাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় ১:৩৬।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর মানদণ্ড অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শ অনুপাত ১:২০। সে হিসেবে ৩৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য বিভাগটিতে কমপক্ষে ১৭ জন রানিং শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি)-এর অ্যাক্রেডিটেশন নির্দেশিকা অনুযায়ী শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১২ হওয়া প্রত্যাশিত। সে হিসাবে বিভাগটির জন্য প্রায় ২৮ জন শিক্ষক প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিতভাবে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৯ জন।
আরও জানা যায়, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বিভাগটিতে রয়েছে ল্যাব সংকটও। বর্তমানে বিভাগে ২টি জেনারেল ল্যাব এবং ২টি রিসার্চ ল্যাব রয়েছে। বিভাগীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে ৬টি জেনারেল ল্যাবরেটরি ও ৪টি রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রয়োজন বলে মনে করেন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন।
বিভাগটিতে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থীকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সর্বমোট ২২টি ল্যাবকোর্স সম্পন্ন করতে হয়। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকায় ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ল্যাব টেকনিশিয়ানের সংকট। বর্তমানে বিভাগে মাত্র ২ জন ল্যাব টেকনিশিয়ান কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ল্যাব ও শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বিভাগটিতে জনবলও সীমিত। বর্তমানে বিভাগে মাত্র ১ জন কর্মকর্তা, ১ জন কম্পিউটার অপারেটর এবং ১ জন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর রয়েছেন। ডাটা এন্ট্রি অপারেটরকে তার নির্ধারিত দায়িত্বের পাশাপাশি অফিস সহায়কের কাজও করতে হয় বলে জানান বিভাগীয় প্রধান।
এছাড়া একটি সেমিস্টারের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ব্যবহারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আনুমানিক ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা প্রয়োজন হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর ওপর ২০ শতাংশ ভ্যাট কর্তনের পর বিভাগটি কার্যত প্রায় ২ লাখ টাকা পেয়ে থাকে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৫০০ টাকা ল্যাব ফি, কেমিক্যালস সোসাইটির জন্য ২০০ টাকা এবং ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষায় প্রতি কোর্সে ২০০ টাকা নেওয়া হয়। প্রশাসনিক বরাদ্দের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত ফি ও ক্যামিক্যাল সোসাইটির আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় কেমিক্যালস, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের চাহিদা পূরণে হিমসিম খেতে হচ্ছে বিভাগটিকে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্নাতক ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হয় ২০২২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। সে অনুযায়ী, চার বছর মেয়াদি কোর্সটি ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত মাস পরও তা শেষ হয়নি। শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের অনার্স শেষ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। উক্ত শিক্ষাবর্ষের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি বিভাগের স্নাতক ইতোমধ্যে শেষ হলেও রসায়ন বিভাগের শেষ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে স্নাতক ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি। সে অনুযায়ী, এই শিক্ষাবর্ষের অনার্স ২৩ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। তবে শিক্ষার্থীরা জানান, বাস্তবে এটি আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে শেষ হতে পারে।
তবে সেশনজট নিরসনে বর্তমান বিভাগীয় প্রধান সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, শেষের কয়েকটি ব্যাচের সেশনজট কমিয়ে আনার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে যে ব্যাচগুলো ভর্তি হবে, সেগুলোতে যেন সেশনজট তৈরি না হয়, সে বিষয়েও বিভাগীয় প্রধান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে রসায়ন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হসান বলেন, 'আমাদের প্রতি সেমিস্টারে ৭ থেকে ৮টার মতো কোর্স থাকে। প্রতিদিন ক্লাস করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। এক ব্যাচের ক্লাস চললে অন্য ব্যাচ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমাদের সায়েন্স ফ্যাকাল্টির সেমিনারে কক্ষে গিয়েও ক্লাস করতে হয় বা অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ক্লাসরুম ফাঁকা আছে কিনা দেখে ক্লাস করা লাগে।'
তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রতিটি ব্যাচে ২-৩ টা করে ল্যাব কোর্স থাকে এবং আমাদের মাত্র দুইটা ল্যাব থাকায় অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ল্যাবকোর্সে যিনি অ্যাসাইনড টিচার থাকেন, তিনি ল্যাব যতক্ষণ পর্যন্ত চলে শিক্ষার্থীদের সাথে থাকেন। কিন্তু আমাদের ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক সংকট থাকায় অনেক সময় ল্যাবে কোর্সে তেমন সময় দিতে পারে না। ফলে অনেক কিছু বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয়। তারপরেও আমাদের টিচাররা যতটুকু পারেন আমাদেরকে সাহায্য করেন।'
২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন বলেন, 'আমাদের ক্লাসরুম ও শিক্ষক সংকট রয়েছে। ক্লাসরুমের অভাবে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে অনেক সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এছাড়াও, সেমিনার কক্ষের দায়িত্বে কেউ না থাকায় সেখানে পড়াশোনা ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করতেও সমস্যা হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ সেশনজটের জন্য বিখ্যাত হলেও বর্তমানে তা অনেকটাই কমে গেছে।'
বিভাগীয় প্রধান শাহাদাৎ হোসেন বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় প্রতিনিয়ত বাড়তি চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন শিক্ষক যখন অতিরিক্ত কর্মচাপের মধ্যে থাকেন, তখন এর প্রভাব শুধু তার পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সেটা তার ক্লাসরুম,পরিবার তথা সামগ্রিকভাবে সমাজের ওপরও পড়তে পারে। তাই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। বিশেষ করে ল্যাব-নির্ভর বিভাগগুলোতে প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির মাধ্যমে অর্গানোগ্রাম নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। সেখানে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী আমাদের বিভাগে ২৬ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৬ জন তন্মধ্যে ৭ জন শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন। শিক্ষক সংকটে শিক্ষকদের বাড়তি কোর্সলোডের কারণে মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব বিভিন্ন সেক্টরেই পড়ছে।'
তিনি যুক্ত করেন, উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, পর্যাপ্ত ল্যাব, ল্যাব টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতে আমরা দেখেছি সরকারী দলগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও জনবলের অভাবে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না।'
সেশনজট নিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের সেশনজট আগের তুলনায় অনেকটা কমে এসেছে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করে সেশনজট শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। ইনশাআল্লাহ, আমার মেয়াদকালেই তা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।'
সার্বিক বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, “রসায়ন বিভাগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাদের শিক্ষার্থীরা অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে আছে। অন্যান্য বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের প্রায় সব ব্যাচের অনার্স শেষ হয়ে গেলেও রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের অনার্স এখনো শেষ হয়নি। আমরা বিভাগের চেয়ারম্যানকে ডেকেছি। এ বিষয়ে ওনার সঙ্গে কথা বলব কেন তাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকবে। দ্রুত সেশনজট কমিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষ করা এবং নির্ধারিত সময়ে সব ব্যাচের পরীক্ষা সম্পন্ন করার বিষয়ে আমরা ওনাকে বলব।”
তিনি আরও বলেন, “বিভাগে শিক্ষক সংকট, ল্যাব সংকট, ল্যাবের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট কিংবা ল্যাব পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে বিভাগ থেকে প্রশাসনের কাছে আবেদন করতে হবে। যেসব সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব, সেগুলো আমরা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেব। আর যেসব সমস্যা সমাধানে সময় প্রয়োজন, সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা হবে।”