পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, এটিকে ‘লুটপাটের লাইসেন্স’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
শনিবার (৮ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় দলটি। এতে বলা হয়, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ চলছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করা হয়, সম্প্রতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর এ উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়ার চার দিনের মাথায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল বিপণনের সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়ার পরিবর্তে কয়েকটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে জামায়াত।
দলটির দাবি, জ্বালানি তেল আমদানির জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও শত শত কোটি ডলারের ব্যাংক ঋণসুবিধার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে এই সক্ষমতা হাতেগোনা মাত্র ৩-৪টি শিল্পগোষ্ঠীর রয়েছে।
তাই সরকারের এই উদ্যোগকে ‘সংস্কার নয়, হস্তান্তর’ বলে মন্তব্য করেছে জামায়াত। দলটির ভাষায়, এটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং ‘দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স’।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত।
তাদের মতে, জ্বালানি তেল প্রতিরক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বিমান চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাত বেসরকারি হাতে গেলে যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের আইনগত সুরক্ষা খর্ব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি। যারা বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করবেন, তাদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা মুক্তবাজার অর্থনীতি বা বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধী নয়। তবে জবাবদিহিহীন ও অস্বচ্ছ উপায়ে রাষ্ট্রীয় খাত বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করছে দলটি।
সরকারের নেওয়া এই উদ্যোগ স্থগিতের পাশাপাশি ছয় দফা দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দাবিগুলো হলো—
১. পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সব উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে।
২. খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশ্যে উন্মুক্ত করতে হবে এবং জনসাধারণের মতামত গ্রহণের জন্য কমপক্ষে ৬০ দিনের সুযোগ দিতে হবে।
৩. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানির আয়োজন করতে হবে। সেখানে বিরোধী দল, ক্যাব, সিপিডি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
৪. বেসরকারিকরণের বদলে বিপিসির সংস্কার করতে হবে। এর মধ্যে স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণের তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৫. ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
৬. জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।