জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার মাহফুজ আলম। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেছেন, “জামায়াতে ইসলামী হলো আওয়ামী লীগের অল্টার ইগো, অর্থাৎ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।” তার ভাষায়, দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ টিকে থাকলে জামায়াতও থাকবে, আবার জামায়াত থাকলেও আওয়ামী লীগ থাকবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিয়ে জামায়াতের কোনো স্বচ্ছ ভিশন বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার প্রচারিত সাড়ে ১৪ মিনিটের এই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, নতুন-পুরনো বন্দোবস্তের সমীকরণ, সংস্কারের ভবিষ্যৎ এবং গণমাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা—এমন নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মাহফুজ আলম। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে তিনি অংশ নিচ্ছেন না। যদিও এটি নতুন খবর নয়, তবে এর পেছনের মূল কারণ হিসেবে তিনি জামায়াত ও আওয়ামী লীগের পারস্পরিক অস্তিত্বের এই রাজনৈতিক সমীকরণকেই সামনে আনেন।
সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম বলেন, তার লক্ষ্য ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণ শক্তিগুলোকে একত্র করে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় বিকল্প’ বা থার্ড অল্টারনেটিভ গড়ে তোলা। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যখন পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অংশ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোট করে, তখন সেই তৃতীয় শক্তি গড়ার স্বপ্ন কার্যত ভেঙে পড়ে বলে তিনি মনে করেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে আরও কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, যাদের সঙ্গে জোট করা হয়েছে তারা পুরনো কাঠামোরই অংশ। তার মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে এমন বহু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, যার কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই, কারণ বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের কোনো স্বচ্ছ রাজনৈতিক ভিশন বা পরিকল্পনা জনগণের সামনে নেই। তিনি মনে করেন, আদর্শিক অবস্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত প্রশ্নে জামায়াতের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মেলবন্ধন সম্ভব নয়।
মাহফুজ আলম আরও বলেন, গত দেড় বছরের রাজনৈতিক যাত্রা তার কাছে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার অভিজ্ঞতা। তার দৃষ্টিতে, পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নতুন মোড়কে আবার ফিরে আসছে, যা জুলাই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ও চেতনার পরিপন্থী। এতে করে আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ না নেওয়ার হতাশা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যৎ সরকার ব্যবস্থা নিয়েও সতর্কবার্তা দেন তিনি। মাহফুজ আলম বলেন, ক্ষমতায় যে দলই আসুক—বিএনপি বা জামায়াত—সমাজের ভেতরে থাকা ক্ষত যদি সারানো না যায়, তবে কোনো সরকারই দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না। শুধু কাগজে-কলমে সংস্কার যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সমাজে ভিন্ন মত ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সমঝোতা বা পুনরায় বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া না হলে মব ভায়োলেন্স ও বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন মাহফুজ আলম। তার মতে, বাংলাদেশের মানুষ এখন গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করে না। এই আস্থা ফেরাতে হলে গণমাধ্যমকে নিজেদের অতীত ভূমিকা নিয়ে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপড়া ও আত্মসমালোচনার জায়গায় আসতে হবে।
বর্তমানে রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে থাকা মাহফুজ আলম সময় কাটাচ্ছেন বই পড়ে এবং হতাশ তরুণদের সঙ্গে কথা বলে। তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতে কীভাবে নতুন করে পথ এগোনো যায়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন। এরপর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ২৮ আগস্ট মাহফুজ আলম প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং একই বছরের ১০ নভেম্বর তিনি সরকারের উপদেষ্টা হন। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।