হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে প্রণালির এক পাশ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদভাবে চালু করা সম্ভব হতে পারে। তবে শর্ত হচ্ছে, আগে এমন একটি চুক্তি করতে হবে যাতে নতুন করে কোনো সংঘাত না ঘটে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তেহরান এই অবস্থান তুলে ধরেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই প্রণালি দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়ে থাকে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শত শত তেলবাহী ট্যাংকারসহ অন্যান্য জাহাজ এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক পারস্য উপসাগরে আটকে পড়েছেন বলে জানা গেছে। গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও প্রণালিতে স্বাভাবিক পরিবহন এখনও পুরোপুরি ফিরেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, যুদ্ধ প্রায় শেষ পর্যায়ে, তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। এদিকে বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান ওমানের জলসীমার দিকে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে পারে এবং সে পথে কোনো বাধা সৃষ্টি না করার ব্যাপারে রাজি হতে পারে। তবে ওই সূত্র জানায়নি, ইরান প্রণালিতে পেতে রাখা মাইন অপসারণ করবে কি না, কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজসহ সব জাহাজকে অবাধ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে কি না।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, এই প্রস্তাব নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কিছু শর্ত বা দাবি মেনে নিতে প্রস্তুত কি না, তার ওপর। তবে হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। একইভাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি।
একটি পশ্চিমা নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ওমানের জলসীমা দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা ও প্রস্তুতির কাজ চলছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এসেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। উল্লেখ্য, ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি মাত্র ৩৪ কিলোমিটার চওড়া এবং এই পথ দিয়েই পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে যাতায়াত করা হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল, গ্যাস, সারসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনে এটি অত্যন্ত কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান আরও কঠোর কিছু অবস্থান নিয়েছিল। এর মধ্যে প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টাকা আদায় কিংবা পুরো প্রণালির ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো প্রস্তাবও ছিল। তবে এবার ওমানের জলসীমা দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার নতুন প্রস্তাবকে তেহরানের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সপ্তাহে লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে বিভিন্ন দেশ ইরানের শুল্ক আরোপের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ১৯৬৮ সালে একটি নিয়ম প্রণয়ন করা হয়েছিল, যেখানে ইরান ও ওমানের মাঝ দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ আলাদা করে নির্ধারণ করা হয়, যা বর্তমান নৌপরিবহন ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে তেল পরিবহনকারী জাহাজগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।