মা-বাবা ছোট দুই ভাই-বোনকে বেশি ভালোবাসেন এমন ধারনা থেকে এক প্রতারক কবিরাজ চক্রের স্মরণাপন্ন হন শেরপুর জেলার মোছা.লুবাবা (১২) নামের এক শিশু। প্রতারণার বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছেন জামালপুর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদস্যরা। এ প্রতারণার মুলহুতা মনির হোসেনকে (২১) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬) দুপুরের দিকে জামালপুরের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিটিআই) পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত (পিপিএম) এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শিশু লুবাবা শেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
প্রতারক মনির হোসেন জামালপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীরচর ইউনিয়নের চর যথার্থপুর চান্দাপাড়া এলাকার মৃত মজিবর রহমানের ছেলে। তিনি মেড ইন জামালপুর নামের একটি পেইজের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর।
পি আই বি’র প্রেস রিলিজ উল্লেখ করা হয়েছে, শেরপুর জেলা সদরের মাধবপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী সাইদুর রহমানের তিন সন্তান। সাইদুর রহমান দম্পতি তার ছোট দুই সন্তানকে বেশি ভালোবাসেন এমন ধারনা সৃষ্টি হয় বড় মেয়ে লুবাবার। এই হতাশা থেকে ওই মেয়ে মা-বাবার অজান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে কিভাবে মা-বাবাকে আপন করে পাওয়া যায় সেই বিষয়ে ভিডিও দেখা শুরু করেন। টিকটকে তান্ত্রিক পরিচয়ধারী জনৈক মো.খোরশেদ কবিরাজের সাথে ওই শিশু মেয়ের পরিচয় হয়।
সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রতারক কবিরাজ তার সহকারী “কবিরাজ” নামের দুইটি ও “আল্লাহর দান” নামের একটি ইমু একাউন্টের ওই শিশু মেয়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেন এবং সকল সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন। এ বাবদ কবিরাজ ফি, একটি খাসি, চারটি জায়নামাজ, ৪ টি আগর বাতি, চারটি মোমবাতি, পাঁচ কেজি গরুর দুধ ও ফল এবং মন্ত্রে কাজ না হওয়ায় জোড় শুকর, দুই কেজি চন্দন কাঠ কেনার কথা বলে ২ লাখ ৪৩ হাজার ১৫০ টাকা গত ৬ মার্চ থেকে ৯ মার্চ পর্য ধাপে ধাপে বিকাশে নিয়ে নেয়। এতেও কাজ না হলে ওই শিশুর মা-বাবার ব্যবহারের সাড়ে ২৭ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ১ লাখ টাকা কৌশলে হাতিয়ে নেয় ওই প্রতারক চক্র।
এরপর পুনরায় টাকার দাবি করলে ওই শিশু টাকা পাঠাতে বিকাশের দোকানে গেলে দোকানী কম বয়স হওয়ায় তার বাবাকে বিষয়টি ফোনে জানান। পরে শিশুর বাবা প্রতারণার বিষয়টা জানতে পেরে শেরপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার বিষয়টি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) হেডকোয়ার্টার্সের অ্যাডিশনাল আইজিপি মো.মোস্তফা কামালের নজরে আসে। পরে তার নির্দেশে জামালপুর সিবিআই’র পুলিশ পংকজ দত্ত মামলার তদন্ত শুরু করেন। জামালপুর পিটিআই সদস্যদের কয়েকটি টিম মামলার রহস্য উদঘাটনের কাজ শুরু করেন। পরে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গত ৯ এপ্রিল গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এমসি এলাকা থেকে ঘটনার সাথে জড়িত জামালপুর সদর উপজেলার চর যথার্থপুর চান্দাপাড়া এলাকার মো.মোস্তফার ছেলে মো.মুছা মিয়া (২৯) ও একই এলাকার মৃত নবাব আলীর ছেলে মো.রফিকুল ইসলামকে (২৮) প্রথমেই গ্রেপ্তার করে সিবিআই সদস্যরা। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতারক চক্রের মুলহোতা অবস্থান নিশ্চিত হয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি উপজেলার মাসকান্দা নতুন বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো.মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাকে সাথে নিয়ে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বাড়ীর পাশে বাগানে মাটির নিচ থেকে ২৫ ভরি ৯ আনা ৪ রতি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। এ সময় তাদের সাথে থাকা আই ফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সসহ পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মালামালের মূল্য ৬৪ লাখ টাকা (আনমানিক) বলে জানান পুলিশ। পরে তাকে শেরপুর আদালতে পাঠানো হয়েছে।
জামালপুর পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার বলেন, মামলার বিষয়টি জানার পরপরই রহস্য উদঘাটনের কাজ শুরু করি। এই ইউনিটের চৌকস সদস্যদের কয়েকটি টিমে ভাগ করে তাদের আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তদারকি করি। অভিযান টিমগুলোর কঠোর পরিশ্রমে মামলার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয় এবং মামলার মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। এ সময় প্রতারণা করে নেওয়া প্রায় ২৬ ভরি স্বর্ণালংকার ও এ সময়ের সবচেয়ে আধুনিক মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। চটকধারী ধারি বিজ্ঞাপন দেখে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো প্রকার অর্থ লেনদেন না করার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।