দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না থাকা এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিচালন ব্যয়। ফলে বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে ব্যাংক ঋণের ওপর।
চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার নিয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বিশেষ নিলামের মাধ্যমে আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার।
ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়ে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার কারণে সরকার এখন অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে এবং সেই ঋণ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কমে যাওয়ায় পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে বাধ্য হয়ে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য খুবই নেতিবাচক সংকেত।
সরকারি ঋণ বাড়লেও বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে মাত্র ৬ শতাংশ, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়তে থাকলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, ফলে অনেক ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। এর মধ্যে সরকার যদি অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে অর্থায়নে বাধা তৈরি হতে পারে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে অর্থনীতিতে চাহিদা কম থাকায় পরিস্থিতি ততটা স্পষ্ট নয়। তবে ভবিষ্যতে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে এবং সরকার কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে ব্যর্থ হলে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব দেখা দিতে পারে। তখন সুদের হার বাড়বে, আমানতের সুদ বাড়বে এবং ঋণের সুদও বেড়ে যাবে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে সরকারের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।