সমান পরিশ্রমেও বৈষম্যের শিকার কিশোরগঞ্জের নারী কৃষিশ্রমিকেরা

দে
আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:০১
সমান পরিশ্রমেও বৈষম্যের শিকার কিশোরগঞ্জের নারী কৃষিশ্রমিকেরা


এক সময় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে কৃষিতে সস্তায় শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষেতমজুর পরিবারের পুরুষরা। কিন্তু কালের বিবর্তন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় সে দিন বদলে গেছে।দিন বদলের এই অগ্রযাত্রায় অনেক ক্ষেতমজুর পরিবারে ফিরেছে আর্থিক সচ্ছলতা। কেউবা উচ্চ মজুরির সন্ধানে শহরের দিকে ঝুঁকছেন। এ ছাড়া কৃষিকাজ অনেকটাই মৌসুমী হওয়ায় অনেক সময় কাজের অভাবে কৃষি শ্রমিককে বসে থাকতে হয়। তাই ধারাবাহিক বা দৈনন্দিন ভালো আয়-রোজগারের আশায় কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ ইজিবাইক বা অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ কেউ নির্মাণ শ্রমিক, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক পেশা বেছে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এমন কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততায় কৃষিকাজে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ দিন দিন কমে আসলেও গ্রামীণ নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।গ্রামীণ নারী শ্রমিকের চাহিদা ও কদর বাড়লেও মিলছে না ন্যায্য মজুরি। যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা, সেখানে একজন নারী শ্রমিকের মজুরি মাত্র ৩০০ টাকা।


পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকের মজুরি কম হওয়ায় কৃষকরাও তাদের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই ধরনের কাজ করেও চরম মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর হাজারো পরিবারের নারী শ্রমিকরা।ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এই নারী শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা। নিজের ক্ষুধা, অসুস্থতা কিংবা ব্যক্তিগত নানা কষ্ট আড়াল করে তাঁরা ছুটে যান কাজের সন্ধানে। সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম, ঘামে ভেজা শরীর আর ক্লান্ত চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে কাজ করলেও দিন শেষে মেলে না ন্যায্য মজুরি। সংসারের অভাব, সন্তানের লেখাপড়া, মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং পরিবারের বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিদিনই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। অথচ পুরুষের সমান পরিশ্রম করা এবং সমাজ ও গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও মজুরি বৈষম্যের শিকার হয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন তাঁরা।ঘামের শ্রমে দিন শেষে একজন নারী শ্রমিকের হাতে আসা ৩০০ টাকা মজুরি দিয়ে ৫-৬ জন সদস্যের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার পর পরিবারের অন্যান্য চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, পোশাক-আদি, অসুস্থজনিত চিকিৎসা ও ওষুধ কেনা—সবকিছুই যেন তাঁদের কাছে একেকটি কঠিন পরীক্ষা।


জীবনে শখ-আহ্লাদ বলতে কিছু নেই, ভালো খাবার খাওয়ার ইচ্ছেটুকুও চাপা পড়ে যায় অভাবের কাছে।নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, কাজের ধরন ও পরিশ্রম প্রায় একই হলেও মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়। দিনের পর দিন শ্রম দিয়েও ন্যায্য পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তাঁরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। অথচ মজুরি বৈষম্যের প্রতিবাদ করলে পরবর্তীতে কোনো কৃষকের জমিতে বা কর্মক্ষেত্রে কাজের সুযোগ মেলে না। কাজ হারালে সংসার ও সন্তানের মুখে খাবার উঠবে কীভাবে? এই অসহায়ত্ব তাঁদের নীরবে শোষণ সহ্য করতে বাধ্য করে।সরেজমিনে দেখা গেছে, সারা বছর গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির নানা কাজ, পরচুলা কোম্পানিতে, হোটেল, বাসাবাড়ি, মিল-চাতালে, সড়কে মাটি কাটাসহ বহুমাত্রিক কাজে নারীদের সরব উপস্থিতি। স্বামী-সংসার ও গৃহস্থালির কাজ সামলানোর পাশাপাশি তাঁরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করে চলেছেন।


উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, সমতলভূমির দিগন্তজোড়া মাঠে আগাম আলু রোপণ, পরিচর্যা এবং শীতকালীন রকমারি সবজি চাষে মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। এসব কর্মযজ্ঞে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নানা বয়সী নারী শ্রমিকের আধিক্য অনেক বেশি।পুটিমারী ইউনিয়নের হিন্দু পাড়া ব্লকে আব্দুল আজিজ ওরফে ঢেমসা নামের এক কৃষকের জমিতে শতাধিক নারী শ্রমিক আলু রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ সময় ষাটোর্ধ্ব ওমিলা বেওয়া ও শিল্পী রানী জানান, অভাবের তাড়নায় তাঁরা ৩০০ টাকা মজুরিতে এই কাজ করছেন। বাজারের যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তাতে ৩০০ টাকা দিয়ে তিন বেলা লবণ-ভাতও জোটে না। মজুরি বৃদ্ধির কথা বললেও কৃষকরা কাজে আসতে নিষেধ করেন।সচেতন মহল বলছেন, কিশোরগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে গ্রামীণ নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রায় প্রতিটি ধাপে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। অথচ তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়াটা খুবই দুঃখজনক। নারী-পুরুষের সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বৈষম্য দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।এ বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুরুন্নাহার শাহাজাদী বলেন, ‘কৃষিখাতে পুরুষ শ্রমিক সংকটে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা নারীদের অধিকারের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তুলে ধরে আসছি। সব স্তরের মানুষ একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল নারীদের এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব।

সর্বশেষ সংবাদ

একই বিভাগের আরও সংবাদ

🏠 হোম জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক সারাবাংলা খেলাধুলা আইন আদালত বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি প্রবাস ধর্ম তথ্য ও প্রযুক্তি লাইফস্টাইল অপরাধ নারী ও শিশু রাজধানী অন্যান্য