২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: কোটা সংস্কার ঘিরে জন্ম নেয় এক রক্তাক্ত ইতিহাস – দৈনিক দেশেরকথা
arif khanh
৪ জুলাই ২০২৫, ৬:৩৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলন: কোটা সংস্কার ঘিরে জন্ম নেয় এক রক্তাক্ত ইতিহাস

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় একটি রায় দেশের ছাত্রসমাজকে নাড়িয়ে দেয়। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের রায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে জন্ম নেয় চরম ক্ষোভ। তারা বিশ্বাস করছিল, এই সিদ্ধান্ত যোগ্যতা ও সমতা ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থাকে বিপন্ন করবে।

এরপরই শুরু হয় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ও বিস্তৃত ছাত্র আন্দোলন।

আন্দোলনের সূচনা ও বিস্তার:

হাইকোর্ট ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সরকারি সার্কুলারকে অবৈধ ঘোষণা করলে, ছাত্রসমাজ এই রায়কে অন্যায় ও বৈষম্যমূলক বলে চিহ্নিত করে। এই রায়ের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজপথে নামে।

শাহবাগ হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। ৪ জুলাই, শুক্রবার রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান নেয় হাজারো শিক্ষার্থী। শাহবাগ থেকে সায়েন্স ল্যাব, মৎস্য ভবন, ফার্মগেট পর্যন্ত সড়ক অবরোধে পড়ে। ঢাকার জনজীবন থমকে যায়। যাত্রীরা পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হন।

সমর্থন ও সরকারের প্রতিক্রিয়া:

এই ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিবাদে রূপ নেয়। সমাজের নানা স্তর থেকে সমর্থন আসতে থাকে অভিভাবক, শিক্ষক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিককর্মী, এমনকি রাজনৈতিক নেতারাও একে একে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান।

তবে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল বিপরীত। ছাত্রদের দাবিকে আমলে না নিয়ে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে নির্দেশ দেয়। রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়িয়ে দেওয়া হয় পুলিশের উপস্থিতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতভর তাণ্ডব:

৪ জুলাই রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে শুরু হয় এক ভয়াবহ অভিযান। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ইন্টারনেট সংযোগ কেটে দেওয়া হয়, যেন ছাত্রদের আর্তনাদ দেশের মানুষ না শুনতে পারে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয় টিএসসি, কার্জন হল, শাহবাগ, নীলক্ষেতসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে।

হলগুলোতে ঢুকে রুম থেকে টেনে বের করে শিক্ষার্থীদের মারধর করা হয়, মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়, ছবি-ভিডিও মুছে ফেলা হয়। মেয়েদের হলেও ঢুকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠে, যা ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।

এই রাতভর তাণ্ডব যেন ছিল স্বাধীন দেশের ভেতরে এক দুঃস্বপ্ন। তবুও, পরদিন সকালে আবার রাজপথে দেখা যায় সেই একই শিক্ষার্থীদের মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখে অশ্রু, আর মুখে একটাই স্লোগান“বৈষম্যের অবসান চাই”।

সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া আগুন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর এই বর্বর হামলার প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। দেশের প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেলা কলেজ সবখানেই রাজপথে নামে ছাত্রসমাজ।

সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ড করে #JusticeForStudents, #NoQuota, #StopPoliceBrutality। সাধারণ মানুষও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।

আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তি:

এই আন্দোলন ছিল নেতৃত্বহীন কিন্তু সংগঠিত। ছাত্ররা নিজ উদ্যোগে কর্মসূচি ঘোষণা করে, সংগঠন ছাড়াই সবাই এক কণ্ঠে কথা বলে। তারা দেখিয়ে দেয়—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখনো ছাত্রদের হাতে নিরাপদ, কারণ তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং অমানবিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে জানে।

উপসংহার:

২০২৪ সালের কোটা বিরোধী এই ছাত্র আন্দোলন ইতিহাস হয়ে থাকবে প্রতিবাদের সাহসিকতা, দমননীতির নির্মমতা এবং ছাত্রসমাজের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে।

একদিকে ছিল রাষ্ট্রীয় শক্তি, দমন, নির্যাতন; অন্যদিকে ছিল তরুণদের দৃঢ় চেতনা, ন্যায়ের প্রতি বিশ্বাস এবং একতার শক্তি।

এটি ছিল এক ইতিহাস যেখানে ভয় নয়, আশা জিতেছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খুব শিগগিরই চীন সফরে যাচ্ছেন পুতিন: ক্রেমলিন

ঢাকার যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের সভা

হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় এনসিপির ১৩ নম্বর হেল্পলাইন চালু

দেশের ১২ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ

জল্লারপাড় ব্রিজে ডাকাতি প্রস্তুতিকালে ২ জন গ্রেফতার, সরঞ্জাম উদ্ধার

রূপগঞ্জে চোরাইকৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার, গ্রেফতার ১

আইনজীবীর পোশাকে কলকাতা হাইকোর্টে মমতা, ভোট-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ

‎কামারখন্দের ভদ্রঘাট ইউনিয়ন পরিষদের উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

একের পর এক মন্ত্রীর পদত্যাগে চাপের মুখে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী

বেনাপোলকে সবুজ নগরী গড়তে যুবদল নেতা ইমদাদুল হক ইমদার বৃক্ষরোপণ

১০

এপ্রিলে আইসিসির সেরা খেলোয়াড় নাহিদ রানা

১১

ঈদুল আজহায় টানা ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা, প্রজ্ঞাপন জারি

১২

গোবিপ্রবির আওয়ামীপন্থী ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী দুই শিক্ষকের ‘প্রগতিশীল শিক্ষক’ ব্যানারে আন্দোলন

১৩

কুবির নতুন উপাচার্য ড. এম এম শরীফুল করীম

১৪

গলাচিপায় এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

১৫

ডিন নিয়োগ বিতর্কে কুবি প্রশাসনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

১৬

ভুয়া ট্রেড ইউনিয়নের খপ্পরে পোশাক শ্রমিকরা

১৭

তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে সামলালে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাতের ঝুঁকি: ট্রাম্পকে সতর্ক শি জিনপিং

১৮

গোবিপ্রবিতে ভেটেরিনারি টিচিং হাসপাতালের উদ্বোধন

১৯

এসএসসি শুরু ৭ জানুয়ারি, এইচএসসি ৬ জুন

২০