হবিগঞ্জের হাওরে অকাল বন্যায় জেলার প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো পানিতে তলিয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের দফায় দফায় বৃষ্টিতে হাওরে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার নবীগঞ্জ, বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার বিভিন্ন হাওরের ওই পরিমান বোরো জমির ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে উদ্বিঘ্ন হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। গোলায় ধান তুলা নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বোরো মৌসুমে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। এর মাঝে আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ১৪ হাজার ৬০১ হেক্টর, বানিয়াচংয়ে ৩৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর, নবীগঞ্জে ১৮ হাজার ৯৫৬ হেক্টর, লাখাইয়ে ১১ হাজার ২০৮ হেক্টর, হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ৯ হাজার ৩৫০ হেক্টর, শায়েস্তাগঞ্জে ২ হাজার ৭১৫ হেক্টর, মাধবপুরে ১২ হাজার ১৫০ হেক্টর, চুনারুঘাটে ১২ হাজার ৫৪৫ হেক্টর, বাহুবলে ৮ হাজার ৪১৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। তবে এ বছর মৌসুমের শুরুতেই বৃষ্টির পানি জমে ২৮১ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মন্নান মিয়া জানান, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে তাদের এলাকায় উগলী, বাতাসর ও বালি হাওরের বিস্তীর্ণ জমির ফসল পানিতে তলীয়ে গেছে। সুজাতপুর, ইকরাম, শতমুখা মিলিয়ে কয়েকটি হাওরের প্রায় ২ হাজার বিঘার মতো জমির ধান পানিতে তলীয়ে গেছে। ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে পঁচন ধরতে শুরু করেছে । ধান তুলতে না পারলে কৃষকদের খেয়ে বাঁচা কঠিন হয়ে পড়বে। ইকরাম গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আহলাদ মিয়া জানান, ঋণ করে ৮ বিঘা জমি বর্গা নিয়েছেন। বিঘা প্রতি দিয়েছেন ৩ হাজার ৫শ’ টাকা। এসব জমিতে তিনি বোরো আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সব ফসল এখন পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। ফসল হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। ঋণ পরিশোধ আর পরিবারের বছরের খাবার যোগান দেয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।
সুজাতপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাদিকুর রহমান বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে রত্না নদীর বাঁধ উপচে উগলী, বাতাসর ও বালি হাওরে পানি প্রবেশ করছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে কৃষকদের প্রায় ৭ হাজার বিঘার মতো জমির কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, দুয়েকটি হাওর আমাদের জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
সে ক্ষেত্রে হাওরের সংযোগ খাল খননও এ প্রকল্পের অধিনে আছে। আমরা চেষ্টা করছি এ প্রকল্পের মাধ্যমে যেন আরও দুয়েকটি হাওর যুক্ত করতে পারি। সংযোগ খালগুলো খনন করলে পানি হাওরে জমে থাকবেনা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আকতারুজ্জামান বলেন, হাওরে যে পানি জমে আছে তা বৃষ্টির পানি।
এটি নদী থেকে আসা পানি নয় তাছাড়া নদীর পানি হাওরের পানির চেয়ে উপরে আছে। যদি হাওরের পানি কমানোর জন্য নদীর বাঁধ কাটা হয় তবে উল্টো নদীর পানি হাওরে প্রবেশ করবে। এ অবস্থায় সহসা হাওরের পানি কমার কোন সম্ভাবনা আপাতত নেই। তিনি বলেন, এখনও পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি হিসেব করা যায়না। তবে আমরা নিয়মিত হাওর পর্যবেক্ষণ করছি। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জেলার হাওর বেষ্টিত বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, নবীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার অধিকাংশ জনগোষ্ঠী কৃষির উপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে বোরো আবাদ অন্যতম। প্রায় বছরই অতিবৃষ্টি, বানের পানি, নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাঁধ ভেঙ্গে এসব এলাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
প্রতি বছরই সরকার এসব এলাকায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে নানা প্রকল্প নেয়। কিন্তু স্থায়ী টেকসই কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়না। চলতি বছর চৈত্র মাসের শুরু থেকেই বৃষ্টিপাত হতে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে ইতিমধ্যেই জেলার বিস্তীর্ণ হাওরের জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার বিঘা বা সাড়ে ১৩শ’ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা জানান ধানের শীষ বের হওয়ার এ পর্যায়ে ধানক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফসল ঘরে তোলার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। এতে তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।