“মা আমাকে বাঁচাও, আমি বাঁচতে চাই মা”—কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত ১৪ বছর বয়সী সাহেদের এই আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের গেট এলাকা। অসহায় বাবা আব্দুর রশিদ ও মা আরোশী বেগম ছেলেকে বাঁচাতে হাসপাতাল থেকে ফার্মেসি—সবখানে ঘুরেও পাচ্ছেন না জলাতঙ্কের টিকা।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন জলাতঙ্কে আক্রান্ত রোগী টিকা নেওয়ার আশায় হাসপাতালে আসছেন।
জানা যায়, সদর উপজেলার একডালা গ্রাম থেকে সাহেদকে নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে আসেন তার বাবা-মা। কিন্তু হাসপাতালে সরকারি টিকা নেই। বাইরে যে টিকার দাম সাধারণত ৫০০ টাকা, তা এক হাজার টাকা দিয়েও কোথাও মিলছে না। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, জেলার সব বেসরকারি ফার্মেসিতে খোঁজ করেও টিকা পাননি তারা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টিকা না পেলে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে চরম আতঙ্কে।
উপজেলার খোকসাবাড়ি থেকে আসা রোগীর স্বজন কাদের মিঞা বলেন, আমার আত্মীয়ের জন্য আজ ঢাকা থেকে টিকা এনে দিয়েছি। এখানে কোথাও পাওয়া যায়নি।
জলাতঙ্ক টিকা প্রদানের দায়িত্বে থাকা নার্স আয়শা জানান, গত ১৪ ডিসেম্বর থেকেই হাসপাতালের ভ্যাকসিন মজুত শেষ হয়ে গেছে। ঢাকায় একাধিকবার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রতিদিন শতশত রোগী টিকার জন্য ভিড় করছে। আগে রোগীরা বাইরে থেকে টিকা এনে দিতেন, এখন বাইরে থেকেও আর পাওয়া যাচ্ছে না।
কাজিপুর উপজেলা থেকে আসা রোগীর স্বজন জুরান আলী বলেন, আমার ছেলেকে কুকুর আঁচড় দিয়েছে। উপজেলা হাসপাতাল থেকে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এখানে এসে শুনি টিকা নেই, বাইরে কিনতেও পাচ্ছি না।
সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা আমেনা খাতুন জানান, তার মেয়েকে বিড়াল আঁচড় দেওয়ায় অনেক খোঁজাখুঁজির পর দ্বিগুণ দামে টিকা কিনে আনতে হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিনশ থেকে চারশ কুকুর, বিড়াল ও সাপ কামড়ের রোগীর টিকা প্রয়োজন হয়।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে হাসপাতালে আসা রোগীদের সহযোগিতায় আমরা সব ধরনের মানবিক সহায়তা দিচ্ছি।
জেলা ভ্যাকসিন স্টোর কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, এক মাস আগে জেলায় মাত্র ৫০০ ডোজ ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে। সিভিল সার্জনের নির্দেশে সেগুলো থেকে প্রতিটি উপজেলায় ৫০টি করে সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা অপ্রতুল। ঢাকাতেও বর্তমানে ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। সদর হাসপাতালে মাঝে মাঝে চার-পাঁচশ ভ্যাকসিন আসে, যা দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।
সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আকিকুর নাহার বলেন, প্রায় এক মাস ধরে হাসপাতালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নেই। সরকারি-বেসরকারি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রামীণ ও দুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একাধিকবার ঢাকায় চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও এখনো ভ্যাকসিন পাওয়া যায়নি।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমীন ভিন্ন দাবি করে বলেন, জেলায় জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের কোনো সংকট নেই। তবে স্বাস্থ্য প্রশাসনের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। দ্রুত পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ না হলে যে কোনো সময় ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।