মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বহুল আলোচিত ‘ডেরা রিসোর্ট এন্ড স্পা’র বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে জেলা প্রশাসকের গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে কৃষিজমি দখল, কবরস্থান ভরাট, পরিবেশ দূষণ এবং অনৈতিক কার্যক্রমের মতো অভিযোগগুলো তুলে ধরেছে। এর প্রেক্ষিতে, কমিটি এই রিসোর্টকে কোনো লাইসেন্স না দেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট সুপারিশ করেছে।
বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহকারী নিয়ন্ত্রক (সিনিয়র সহকারী সচিব) শেখ রাজেদউজ্জামান স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক কর্তৃক গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি অভিযোগকারীদের বক্তব্য এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের জবাব বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে যাতে স্বাক্ষর করেন- তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নাজমুল হাসান খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিবালয় সার্কেল) সাদিয়া সাবরিনা চৌধুরী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন, কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মো: মোজাম্মেল হোসেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো: আহসান কবির বুলবুল ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ মিয়া।
প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রধান অভিযোগগুলো হলো- কৃষিজমি দখল ও ক্ষতিপূরণ না দেওয়া, কবরস্থান দখল, অসামাজিক ও অনৈতিক কার্যক্রম, পরিবেশ দূষণ ও হয়রানি। এছাড়াও, স্থানীয়দের নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে ঐ রিসোর্ট এন্ড স্পা সেন্টারটির বিরুদ্ধে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেরা কর্তৃপক্ষ জোর করে কৃষিজমি দখল করেছে।
অভিযোগকারীদের মধ্যে মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক দাবি করেন, তার প্রায় ৮৫ শতক জমি জোর করে দখল করা হয়েছে।
আরেক অভিযোগকারী, ইসমাইল জানান, তার ৩ শতক জমিসহ একটি ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৫ লাখ টাকা।
হযরত আলী ও ইসমাইল নামের দুই অভিযোগকারী জানান, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তাদের জোর করে কবরস্থান দখল করে নিয়েছে, যেখানে প্রায় ১০০-১৫০ জনের কবর ছিল। নতুন কবরস্থানের জন্য ৬ লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা ৫ লাখ টাকা দিয়ে কবরের ওপর হরিণ পালনের জন্য ঘর তৈরি করেছে।
স্থানীয় আলেম সমাজসহ বহু মানুষ অভিযোগ করেন, রিসোর্টের ভেতরে উচ্চস্বরে গান-বাজনা, নাচ, জুয়া এবং মদ্যপানের আসর বসে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এসব কার্যক্রমের কারণে এলাকার যুবসমাজ নষ্ট হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক অভিযোগকারী জানান, তিনি তার বন্ধুর জন্মদিনে রিসোর্টে মদ পরিবেশন হতে দেখেছেন।
অভিযোগকারীরা বলেন, রিসোর্টের পাশে খোলা ডাস্টবিনের দুর্গন্ধে এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এছাড়া, বালু ভরাট করে পানি নিষ্কাশনের নালা বন্ধ করে দেওয়ায় পার্শ্ববর্তী জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। জমি দিতে রাজি না হওয়ায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ‘ডেরা রিসোর্ট এন্ড স্পা’ নির্মাণে ভূমি ব্যবহার আইনসহ বিভিন্ন সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। কমিটির মতে, রিসোর্টটি কৃষি জমি নষ্ট করে তৈরি করা হয়েছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ১৫-২০ বিঘা জমিও তারা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে তদন্ত কমিটি একমত পোষণ করে যে, এই প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদান করা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। এছাড়া, ভবিষ্যতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলেও তারা উল্লেখ করেছে।
এদিকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রিসোর্টের অপারেশন ম্যানেজার, প্যানেল আইনজীবী এবং প্রজেক্ট ম্যানেজার জানান- তারা অল্প অল্প করে জমি কিনেছেন।
জোর করে জমি দখলের অভিযোগের জবাবে তারা বলেন- মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক তাদের কাছ থেকে বায়না বাবদ ২০,০০০ টাকা নিয়েছিলেন, কিন্তু তার নামে জমির নামজারি না থাকায় তিনি জমি রেজিস্ট্রি করতে পারেননি।
তবে অসামাজিক কার্যক্রম ও পরিবেশ দূষণসহ অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে তাদের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত ও পরিষ্কার জবাব পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, এর আগে মানিকগঞ্জের ঘিওরের এই ডেরা রিসোর্টের নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে রিসোর্টটি বন্ধের দাবি জানিয়েছিলো স্থানীয়রা। এ নিয়ে একাধিকবার মানববন্ধন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড.মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন- মন্ত্রনালয়ের আদেশ বাস্তবায়ন করা হবে।
তদন্তের পর ডেরা রিসোর্ট এন্ড স্পা’র লাইসেন্স নিষিদ্ধের ব্যাপারে মানিকগঞ্জের সচেতন মহল ও নাগরিক সমাজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে।