আইপিএলের স্কোয়াড থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে ভারত বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) জানিয়েছে, টাইগাররা ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলবে না এবং ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য আইসিসিকে অনুরোধ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মত প্রকাশ করেন সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। তার এই অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় বিসিবির পরিচালক ও বোর্ডের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল ইসলাম তামিমকে ‘ভারতের দালাল’ বলে মন্তব্য করেন, যা ঘিরে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তামিম ইকবালের একটি দীর্ঘ পোস্টের ফটোকার্ড শেয়ার করে নাজমুল ইসলাম লেখেন, ‘এইবার আরও একজন পরীক্ষিত ভারতীয় দালালের আত্মপ্রকাশ বাংলার জনগণ দু’চোখ ভরে দেখল।’ কিছু সময়ের মধ্যেই তিনি পোস্টটি সরিয়ে নিলেও ততক্ষণে সেটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সাবেক জাতীয় অধিনায়ককে নিয়ে এমন মন্তব্য করায় নাজমুল ইসলামকে ঘিরে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়।
এই মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের সাবেক ব্যাটার শামসুর রহমান শুভ বলেন, সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালকের এমন বক্তব্যে তিনি ও পুরো ক্রিকেট সমাজ স্তব্ধ ও বিস্মিত। তার মতে, একজন ক্রিকেটারের প্রতি বোর্ড কর্মকর্তার এ ধরনের মন্তব্য চরম নিন্দনীয়, সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং গোটা ক্রিকেট সমাজের জন্য অপমানজনক। তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অভিজ্ঞ স্পিনার তাইজুল ইসলামও নাজমুল ইসলামের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার সম্পর্কে বোর্ড পরিচালকের এমন শব্দচয়ন শুধু রুচিহীনই নয়, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির পরিপন্থি। দায়িত্বশীল পদে থেকে এ ধরনের বক্তব্য বোর্ড কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও আচরণবিধি নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তোলে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ক্রিকেটে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাসকিন আহমেদ ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন বলেন, ক্রিকেট বাংলাদেশের প্রাণ। সেই ক্রিকেটে বড় অবদান রাখা একজন সাবেক অধিনায়ককে ঘিরে এমন মন্তব্য দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে সহায়ক নয়। তারা আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেবে।
একই সুরে কথা বলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মুমিনুল হক। তিনি বলেন, তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের মন্তব্য সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং দেশের ক্রিকেট সমাজের প্রতি অপমানজনক। একজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে ন্যূনতম সম্মান না দেখিয়ে জনসম্মুখে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিসিবির প্রতি আহ্বান জানান মুমিনুল।
এ বিষয়ে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি তামিম ইকবাল। তবে এর আগে ভারতে বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে বিসিবির অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব আলোচনা সম্পন্ন না করে মন্তব্য করলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তার মতে, সিদ্ধান্তের আগে বারবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিলে পরে অবস্থান বদলাতে হলে সেটির ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে তামিম বলেন, অতীতে ভারত সফরে গিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগের মুখে পড়তে হয়নি। পরিস্থিতি এখন কিছুটা ভিন্ন হলেও তিনি মনে করেন, পৃথিবীর অনেক সমস্যাই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দর্শকরা আবেগে অনেক কিছু বলেন, কিন্তু একটি বড় সংস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে আজকের সিদ্ধান্ত আগামী ১০ বছর বাংলাদেশের ক্রিকেট ও খেলোয়াড়দের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটি ভেবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়াকে দুঃখজনক উল্লেখ করলেও আবেগ নয়, বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।
এই ঘটনায় বিসিবি পরিচালকের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে শালীনতা, দায়িত্ববোধ ও বোর্ড কর্মকর্তাদের আচরণবিধি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।