নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশেই রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক

দে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৭
নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশেই রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক



মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সামনে একাধিক ঝুঁকি থাকায় নীতি সুদহার আর কমানোর পথে যায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।


বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নতুন ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি প্রকাশের সময় ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান এ তথ্য জানান। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


ডেপুটি গভর্নর জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার বর্তমান পর্যায়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও এটি স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে আসছে—এমন যথেষ্ট নিশ্চয়তা এখনো তৈরি হয়নি। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা, দেশের বাজারে জ্বালানির নিয়ন্ত্রিত মূল্য ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।


এ অবস্থায় দ্রুত মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আবার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হতে পারে।


খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে


মুদ্রানীতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে সেটি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।


মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে আসায় সার্বিক মূল্যস্ফীতিতেও স্বস্তি এসেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কাটেনি।


জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন হলে সেটিও মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।


প্রবৃদ্ধি ও শিল্প উৎপাদনে চাপ


নতুন মুদ্রানীতিতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো চাপের মধ্যে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ওই সময়ে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।


শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচক গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কিছু সূচকে পুনরুদ্ধারের আভাস পাওয়া গেছে।


উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাহিদার অনিশ্চয়তাকে প্রবৃদ্ধির পথে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা


অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে বিভিন্ন খাতে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগের কথাও মুদ্রানীতিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি রয়েছে।


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, অর্থনীতির সরবরাহসংক্রান্ত সব বাধা শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।


বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশ


গত ২ আগস্ট নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ কার্যকর করার পর আর্থিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। এর পর আন্তঃব্যাংক সুদহার ও সরকারি সিকিউরিটিজের ইল্ডও কমেছে।


তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও বিতরণ এখনো দুর্বল। চলতি বছরের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিনিয়োগে ধীরগতি, ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


অন্যদিকে জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।


রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৮.৯০ শতাংশ


২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ওই অর্থবছরে ব্যালেন্স অব পেমেন্টসে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে।


তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে আবার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মূলত আর্থিক হিসাবের ঘাটতি এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।


অন্যদিকে এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা সহায়তা মিলেছে।


দ্রুত নয়, ধীর পুনরুদ্ধারের আভাস


বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতিতে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখছে। তবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে পার্থক্য রয়েছে।


বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।


মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কত দ্রুত তা কমবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।


সামনে যেসব ঝুঁকি


মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, কঠোর বৈশ্বিক মুদ্রানীতি এবং দেশের জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে সামনের দিনের বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।


কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি ধরে রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য।

সর্বশেষ সংবাদ

একই বিভাগের আরও সংবাদ

🏠 হোম জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক সারাবাংলা খেলাধুলা আইন আদালত বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি প্রবাস ধর্ম তথ্য ও প্রযুক্তি লাইফস্টাইল অপরাধ নারী ও শিশু রাজধানী অন্যান্য