এক সময় পল্লী বাংলার গ্রামঞ্চলের কৃষি নির্ভর কৃষকের সুখ-সমৃদ্ধি, আভিজাত্য, সামর্থ্য ও সামাজিক মর্যাদার অন্যতম প্রতীক ছিল দুই চাকার গরুর গাড়ি।
আর গ্রামীণ জীবনে এ গরুর গাড়ি শুধু একটি বাহনই ছিলনা, ছিল লোকায়েত জ্ঞানের এক অন্যন্য নির্মাণশৈলী। যা দক্ষ কারিগরেরা টুকরো টুকরো কাঠ, বাঁশ, লোহা ও দড়িসহ নানা উপাচারে মনের মাধুরি মিশিয়ে তৈরি করতো নান্দনিক গরুর গাড়ি।
নির্মিত গরুর গাড়ির প্রতিটি অংশে ফুটে উঠতো গ্রামীণ কারিগরদের নিখুঁত দক্ষতা। যার বাড়িতে শক্ত-পোক্ত এ কাঠের তৈরি গরুর গাড়ি ও সুস্থ সবল দুই-তিন জোড়া গরু থাকত, তাকে সবাই সম্মান দিত।
কৃষকের স্বচ্ছলতা ও সমাজ সংস্কৃতির এক অন্যন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত ছিল এই গরুর গাড়ি।
কিন্তু সময়ের বির্বতনে ও প্রযুক্তির দ্রæতগতির যান্ত্রিকরণের ছোঁয়ায় কৃষকের হাজার বছরের লালন করা গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী সেই ধীরগতির দুর্ঘটনা মুক্ত গরুর গাড়ির চিরচেনা দৃশ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে।
সেই যুগের তেল-মবিল বিহীন গরুর গাড়ি ধীরগতির হলেও তেমনি ছিলনা দুর্ঘটনা ও পরিবেশ দূষণের বালাই। বর্তমান যুগের জ্বালানী নির্ভর দ্রæত গতির যানবাহনের সড়ক দুর্ঘটনায় নিত্যদিন যেমন মৃত্যুর মিছিল চলছে, তেমনি গাড়ির কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ-প্রকৃতি মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
এতে সড়ক দুর্ঘটনা রোধসহ পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় পরিবেশ বান্ধব ও নিরাপদ গরুর গাড়ির ব্যবহার আবার ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
গেল কয়েক দশক আগেও নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ জনপদের কৃষকের উৎপাদিত ফসল থেকে শুরু করে বিবাহ অনুষ্ঠান ও যেকোন ভ্রমণের জন্য একমাত্র বাহন ছিল গরুর গাড়ি। যা ঘরে ঘরে গরুর গাড়ি ও গরুর হাল ছিল।
কৃষকেরা গরুর গাড়িতে গোবর সার, লাঙ্গল, জোয়াল, মই, বীজ-সার নিয়ে মাঠে যেত। মাঠ থেকে উৎপাদিত ফসল বাড়িতে নিয়ে আসা সহ বিভিন্ন দুর গ্রামের হাট-বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যেতেন।
ব্যবসায়ীরা গরুর গাড়িতে মালামাল নিয়ে বিভিন্ন শহর-বন্দর পাড়ি জমাতেন। অনেকে ভাড়ায় চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
শুধু কি তাই, নববধূরা নান্দনিক ছই বা ছাউনি সাজানো গরুর গাড়িতে শশুর বাড়ি-বাবার বাড়ি আসা যাওয়াসহ নাইওর খাওয়ার জন্য যেতেন। রঙিন কাপড়. ফুলের মালা আর গ্রামীণ অলংকরণে সাজানো এ গরুর গাড়িতে নববধূরা বসে থাকতেন খুশির আবেশে। সঙ্গে থাকত ছোট-ছোট দেবর-ননদ, ভাবি ও পাড়া প্রতিবেশিরা। গ্রামের মানুষজন ভিড় জমাত তা দেখার জন্য।
মেলা-বারনিতে আনন্দ উপভোগ করার জন্য ছেলে-মেয়েরা গরুর গাড়িতে চড়ে যেতেন।
বিবাহ অনুষ্ঠানে অসংখ্য গরুর গাড়ির বহরে বর পক্ষ কনের বাড়িতে আসতেন। এসময় গাড়ি বহরের জোড়ায় জোড়ায় গরুর গলার কাসার ঘন্টার টুংটাং শব্দ, লোহার আবরণে কাঠের চাকা ও গরুর খুরের খটখট শব্দ আর গরু শাসনের গাড়িয়ালের নানা হাঁকডাক, মাইকের বাজনায় গ্রামীণ মেঠো পথ মুখর হয়ে উঠতো। এমন দৃশ্য দেখার জন্য শিশু-কিশোর,নারী-পুরুষ হুমড়ি পড়ত।
ওই দিন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নববধূকে মাইক বাজিয়ে ছেলের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। মাইকে বেজে উঠত ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে
ধুত্তুর ধুত্তুর সানাই বাজিয়ে ,
যাবো তোমায় তোমায় শশুর বাড়ি নিয়ে’…।
গরুর গাড়ির চালককে বলা হত গাড়িয়াল। এই গাড়িয়াল ও গরুর গাড়িকে কেন্দ্র করে যুগে যুগে সৃষ্টি বা রচিত হয়েছিল প্রেম, বিরহ, অপেক্ষা ও মাটির গন্ধে ভরা অসংখ্য ভাওয়াইয়া ও লোকগান।
এমনই এক গান…‘ওকি গাড়িয়াল ভাই,
কত রব আমি পন্থের পানে চাইয়া-রে,
যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়,
নারীর মন মর ছুইরা রয়-রে… ওকি গাড়িয়াল ভাই হাকাও গাড়ি তুই চিল মারির বন্দর এ রে’…।
আর এক নববধূর কন্ঠে ভেসে আসতো…
‘আস্তে চালান গাড়ি-রে গাড়িয়াল,
ধীরে চালান গাড়ি,
ভাঙ্গি যায় মোর বুকের পাঞ্জর,
ছাড়তে বাপের বাড়ি-রে…
আস্তে ধীরে চালান গাড়ি-রে গাড়িয়াল,
আর এক নজর দেখিয়া ন্যাং মুই দয়ার বাপের বাড়ি-রে গাড়িয়াল’…।
সব মিলে ধিরে ধিরে গাড়ি চালার আকুতি, মৃদু ছন্দে গড়িয়ে চলা গরুর গাড়ির শব্দ, গরুর গাড়ির যাত্রীর বিরহের সুর আর গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এমন গান, যা আজও লোক সংস্কৃতির অন্যতম সম্পদ।
কখনো গরুর গাড়ি হয়ে উঠেছে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের সেতু, বিরহের মালা। আবার কখনো রাতের আঁধারে দুরে চলে যাওয়ার গাড়ির শব্দই মনে করিয়ে দিয়েছে প্রিয়জনের বিচ্ছেদ।
বিশেষ করে গাড়িতে বর ও নববধূদের যাত্রা শুধু পরিবহনের মাধ্যম ছিলনা, এটি ছিল এক ধরণের উৎসব, আনন্দ ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
গরুর গাড়ি ও গাড়িয়ালকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জীবনে গান, গল্প, কবিতা, নাটক, সিনেমাসহ নানা জীবন্ত উৎসব যুগের পর যুগ চলে আসলেও বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন আর প্রযুক্তির উৎকর্ষতার ফলে সেই চিরায়িত উৎসবের রঙ, সামাজিক মেলবন্ধন আর মাঠ প্রান্তর থেকে ভেসে আসা বর-কনে ও গাড়িয়ালের কণ্ঠে ধুয়া সুরের ভাওয়াইয়াসহ নানা লোক গান যেন আজ হারিয়ে গেছে কোন এক তেপান্তরে।
এখন এক গ্রাম তো দুরে থাক হাজার গ্রাম ঘুরেও উৎসব আর আভিজাত্যের গরুর গাড়ির দেখা পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে কোন ভাগ্যক্রমে উড়োজাহাজ, বাস, মাইক্রবাস, নসিমন-করিমন, চার্জার ভ্যান, ভটভটির ভিড়ে এ আদি ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ির দেখা মেলে কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের মুসা সফি মিয়ার পাড়া ও মাগুড়া কুটিপাড়া গ্রামে।
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রেমী এ মানুষজন লোকশিকড়ের টানে ও মাটির গন্ধে পরম মমতায় আজও ধরে রেখেছেন বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ গরুর গাড়ি।
এসময় দেখা গেছে, তারা সেই দুর গ্রামের ক্ষেত থেকে আমন ধান কর্তন করে গরুর গাড়িতে বোঝাই করে বাড়িতে আনছেন।
আরো দেখা গেছে, শফি মিয়ার পাড়া গ্রামের প্রবীণ তছলিম উদ্দিনের গাড়িতে কাঠের চাকার ব্যবহার চোখে পড়লেও অপরদিকে কুটিপাড়া গ্রামের প্রবীণ কৃষক লিয়াকত আলীর গাড়ির অবকাঠামো থাকলেও নেই কাঠের চাকা। কারিগর না থাকায় ব্যবহার করছেন যান্ত্রিকের টায়ারের চাকা।
দু‘জনের সাথে কথা হলে তারা বলেন, এক সময় গরুর গাড়ি ছিল জীবন যাত্রার অপরিহার্য বাহন। যা কম-বেশি ঘরে ঘরে ছিল এর ব্যবহার। গাড়ির চাকা ও অবকাঠামো নির্মান শিল্পের উপর নির্ভর করে অনেক কারিগর জীবিকা নির্বাহ করতো। আজ হরেক যান্ত্রিকতার ভিড়ে গ্রামবাংলার পথ থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে চিরায়িত ঐতিহ্যের গরুর গাড়ি ও এর সাথে জড়িত কারিগররা।
তবে বাপ-দাদার স্মৃতিবিজড়িত ও প্রাচীন ঐতিহ্যেকে ধরে রাখার জন্যই এই যানবাহন সংগ্রহে রেখেছি। আগে গ্রাম জুড়ে পাকাপোক্ত বিশাল বিশাল গরুর গাড়ি ছিল। এখন আমাদের ছাড়া আর কারো গরুর গাড়ি নেই।
তারা আরো বলেন, আমাদের অনেক দুরদুরান্তের জমিজমা রয়েছে। খরচ সাশ্রয়ে নিজের ইচ্ছে মত এ গরুর গাড়িতে ধানসহ নানা কৃষি উপকরণ বহন করাসহ গরু দিয়ে হাল চাষ করা হচ্ছে। এটাই আমাদের মনের শান্তি।
যতদিন আমাদের জিন্দিগি আছে ততদিন গরুর গাড়ি চলতেই থাকবে। তবে দঃখের বিষয় হচ্ছে কালের বির্বতনে হারিয়ে গেছে গরুর গাড়ি।
কিশোরগঞ্জ সরকারী ডিগ্রী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক গীতিময় রায় বলেন, ইতিহাস মতে জানা গেছে, কালের সাক্ষী গরুর গাড়ি যান্ত্রিকবিহীন যুগে শুধু কৃষক শ্রমিকই নয়,অতীতের রাজা-বাদশা,জমিদার থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষও গরুর গাড়িকে নির্ভরযোগ্য বাহন হিসেবে ব্যবহার করতেন।
গরুর গাড়ি ছিল প্রাচীন বাংলার প্রাণ। যা রাজা-বাদশারা যুদ্ধক্ষেত্রে রসদ পরিবহন, রাজকীয় সফরে যাতায়াত এবং আঞ্চলিক প্রসাশনিক কাজে গরুর গাড়ি ব্যবহার করতেন।
মজবুত কাঠের চাকা,খড় বা পশমে মোড়া আরামদায়ক আসন এসব দিয়ে রাজকীয় গরুর গাড়িগুলো সাধারণ গাড়ির তুলনায় ছিল আরও বেশি সুসজ্জিত ও আরামদায়ক। কৃষকের উঠোন থেকে রাজদরবার পর্যন্ত গরুর গাড়ির বাহনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
বর্তমান যান্ত্রিক যুগে গরুর গাড়ির ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত হলেও গ্রামীণ জীবনে এখনো মাঝে মধ্যে দেখা মেলে এর অবশিষ্ট চিহ্ন। ঐতিহ্যের এই বাহনটি তাই ইতিহাসের পাতায় আজও এক অন্যন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি প্রীতম সাহা বলেন, আগে বাংলা নববর্ষ এলেই বাঙালি সংস্কৃতির মানুষ গ্রামীণ জীবনের নানা ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ নিয়ে মেতে উঠতো। এখন বাংলা নববর্ষবরণ শোভাযাত্রায় সেই আগের মতো গরুর গাড়ির সাথে নানা ঐতিহ্যের সমাহার আর তেমনটা চোখে পড়েনা। গরুর গাড়ি ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরতে কোথাও কোথাও ভাস্কর্য বানানো হয়েছে।
এছাড়াও বাঙালির সমাজ সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকা চিরায়িত ঐতিহ্যগুলোর ঠাঁই হচ্ছে যাদু ঘরে, খোড়াক যোগাচ্ছে বই ও খবরের পাতায়। বিশেষ দিনে এ ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরতে সবার উচিত হারানো ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিল্পকলা একাডেমিতে নানা হারানো ঐতিহ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।