ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনী হাওয়া এখন অনেকটাই ধানের শীষের পক্ষে। ভোটারদের বড় একটি অংশ বিএনপি প্রার্থী ও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এগিয়ে রাখছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি, জীবনের প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়েই বড় ব্যবধানে জয় পেতে যাচ্ছেন তিনি। তবে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, এবারের নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। তবুও সামগ্রিক হিসেবে খানিকটা এগিয়ে রয়েছেন তারেক রহমান।
নির্বাচনী প্রচারণার দৃশ্যপটেও পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আগের মতো কাগুজে পোস্টারের বদলে এবার কাপড়ের তৈরি ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে গুলশান-১ থেকে গুলশান-২, নর্থ অ্যাভিনিউসহ পুরো এলাকা। রোড ডিভাইডার জুড়ে শোভা পাচ্ছে তারেক রহমানের ব্যানার। পাশাপাশি জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীর ব্যানারও সড়কের ওপর আড়াআড়িভাবে ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও জাতীয় পার্টি (জেপি) সমর্থিত প্রার্থী তপু রায়হানের ব্যানারও চোখে পড়ছে।
বিএনপি ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, সোসাইটি ও মার্কেট সমিতির নামেও তারেক রহমানের পক্ষে ব্যানার টানানো হয়েছে। অন্যদিকে মহল্লার অলি-গলিতে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে মাইকে প্রচারণাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ডাব বিক্রেতা মো. জসিম বলেন, বিএনপির কর্মীরা একাধিকবার তার কাছে ভোট চাইতে এসেছেন। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এখনো কেউ সরাসরি ভোট চাইতে আসেনি। তার ধারণা, জামায়াতও ভালো ভোট পাবে, তবে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে থাকবে।
গুলশান-২ গোলচত্বরে তারেক রহমানের নির্বাচনী ক্যাম্পে বসা মাহফুজ আলম জানান, তারা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং বিশাল জয়ের প্রত্যাশা করছেন। অস্থায়ী বুথ থেকে বিএনপির ৩১ দফাসহ বিভিন্ন লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে এবং ভোটারদের জন্য চায়ের আয়োজন রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই জীবনে প্রথমবার ভোট দেবেন। দীর্ঘদিন ভোটের সুযোগ না থাকায় এখন ভোটারদের কদর বেড়েছে, যা মানুষ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। কড়াইল বস্তি তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তারেক রহমান বস্তি এলাকায় ফ্ল্যাট নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন, যা সেখানে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। একদিকে ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা, অন্যদিকে দেশের অন্যতম বড় বস্তি কড়াইলসহ ছোট-বড় প্রায় ১৫টি বস্তি রয়েছে এই আসনে। তিন লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন ভোটারের বড় একটি অংশই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা বস্তিবাসী। বাস্তবে তারাই এই আসনের জয়-পরাজয়ের প্রধান নির্ধারক শক্তি।
স্থানীয়দের মতে, বস্তিবাসীদের ভোটকেন্দ্রে আনা-নেওয়া এবং তাদের মধ্যে সক্রিয় প্রচারণাই ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। যে দল এখানে বেশি সংগঠিত ও সক্রিয় থাকবে, তারাই এগিয়ে থাকবে। সামান্য ঘাটতিতেই পুরো হিসাব বদলে যেতে পারে।
এ কারণেই তারেক রহমান কড়াইল ও ভাষানটেক বস্তি এলাকাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রথম সভা করেন কড়াইল বস্তিতে, দ্বিতীয় সভা ভাষানটেকে। ৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ইসিবি চত্বরে পথসভা করেন তিনি। সেখানে তিনি বলেন, তিনি এই এলাকার সন্তান এবং এই এলাকাতেই বড় হয়েছেন। এলাকার মুরুব্বি, মা-বোন ও ভাইদের কাছে ধানের শীষে ভোট চান তিনি। একই সঙ্গে বালুরমাঠ থেকে জসিমউদ্দিন পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন ডা. এসএম খালিদুজ্জামান। তার পক্ষেও চলছে জোরালো ক্যাম্পেইন। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অস্থায়ী বুথ বসিয়ে লিফলেট বিতরণ ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
এই আসনে আরও যেসব প্রার্থী রয়েছেন তারা হলেন জাতীয় পার্টি (জেপি) থেকে তপু রায়হান, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) থেকে আতিক আহমেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ উল্যাহ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (কাঁঠাল) কামরুল হাসান নাসিম, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মনজুর হুমায়ুন, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. শামীম আহমদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুহাম্মদ রাশেদুল হক, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের এস এম আবুল কালাম আজাদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আনিসুজ্জামান খোকন ও কাজী এনায়েত উল্লাহ। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই বহুমুখী হোক না কেন, বাস্তব লড়াই যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—সে বিষয়ে একমত অধিকাংশ ভোটার।