রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) প্রশাসন ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে খাতা-কলমে দলীয় ব্যানারে সকল প্রকার লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও নামে-বেনামে রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—রাজনীতি নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর?
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে বেরোবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাইদ প্রথম শহীদ হিসেবে আত্মত্যাগ করেন। তার রক্তেই আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন মুহাম্মদ ইউনূস। ৯ আগস্ট তৎকালীন বেরোবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশীদসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন।
১০ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস বেরোবি ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন, শহীদ আবু সাইদের কবর জিয়ারত করেন এবং পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন।
শহীদ আবু সাইদের আত্মত্যাগের পর বেরোবি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং আন্দোলনের চেতনার প্রতীকে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশা করেছিল ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ।
এই প্রেক্ষাপটে উপাচার্য ড. মো. শওকাত আলী রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। এতে শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধার, সহিংসতা হ্রাস এবং সিট-বাণিজ্য বন্ধের আশা তৈরি হয়। কিন্তু নিয়োগ-পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ও নেটওয়ার্কিং সংস্কৃতির কারণে সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ছাত্রসংসদ প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ আইন’ অনুমোদন পায়। ১৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা এবং ২৯ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হলে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের তৎপরতা আবারও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এরপর থেকে কার্যত রাজনীতিকে আর আটকে রাখা যায়নি। বিভিন্ন সংগঠন নামে-বেনামে ক্যাম্পাস ও আশপাশে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনও এসব প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।
এ বিষয়ে ছাত্রনেতা আশিকুর রহমান বলেন, “গণতন্ত্র মানে শুধু দলীয় রাজনীতি নয়; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। ছাত্রসংসদের মাধ্যমে লেজুড়বৃত্তিমুক্ত গণতান্ত্রিক চর্চা সম্ভব, তবে এজন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা জরুরি।”
অন্যদিকে ছাত্রদল নেতা তুহিন রানা বলেন, “ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ছাত্ররাজনীতি প্রয়োজন।”
ডিবেট ফোরামের সাবেক সভাপতি রিশাদ নূর মনে করেন, “বর্তমান প্রশাসনের অধীনে এই নিষেধাজ্ঞা টেকসই নয়। কঠোর প্রয়োগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে এটি কার্যকর হবে না।”
শিবির নেতা শিবলী সাদিক বলেন, “সহিংসতা বা সিট-বাণিজ্য প্রকৃত ছাত্ররাজনীতি নয়। শিক্ষার্থীকল্যাণমূলক রাজনীতি প্রয়োজন, আর এর জন্য ছাত্রসংসদ ও ছাত্ররাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য দরকার।”
শিল্প ও সাহিত্য সংসদের সভাপতি আহসান-উল-জাব্বার বলেন, “সংবিধানের ৩৮ ও ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনীতি করা নাগরিকের অধিকার। তাই নিষিদ্ধ না করে সুনির্দিষ্ট বিধিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।”
উপাচার্য ড. মো. শওকাত আলী বলেন, “সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে নামে-বেনামে কার্যক্রম চলার বিষয়টি দুঃখজনক। আমরা সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করছি।”
সব মিলিয়ে, বেরোবিতে রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলমান যা এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।