শীতকাল এলেই দেশে অগ্নিকাণ্ডের খবর যেন রোজকার ঘটনায় পরিণত হয়। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও একটি অসতর্কতার আগুন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, বাজার, কারখানা বা বস্তিতে। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শুধু সংখ্যায় নয়, মানুষের জীবনে তৈরি হওয়া শূন্যতার মধ্যেও স্পষ্ট।
বাংলাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক হয়ে যায় শীতের শুরু থেকেই। বাতাসে আর্দ্রতা কমে, ফলে দাহ্য পদার্থগুলো সহজে আগুন ধরে। তার ওপর শীতকালে ঘরে ঘরে কয়লা, কাঠ বা ইলেকট্রিক হিটার ব্যবহার বেড়ে যায়। অসংখ্য এলাকায় পুরোনো তার, নষ্ট সুইচ বা ওভারলোডেড মাল্টিপ্লাগ আগুন লাগার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া বস্তি ও বাজার এলাকার ঘরগুলোর নির্মাণশৈলী আগুন ছড়ানোর জন্য পুরোপুরি অনুকূল টিন তেঁতুল কাঠের ঘর, গা ঘেঁষাঘেঁষি দোকান, মাঝখানে সংকীর্ণ গলি, আগুন নেভাতে দমকলের দেরি সব মিলিয়ে কয়েক মিনিটেই পুরো এলাকা ছাই হয়ে যায়।
অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ড তদন্তে যে বিষয়টি বারবার উঠে আসে, তা হলো মানবিক অসতর্কতা। গ্যাসের চুলা ভালোভাবে বন্ধ না করা, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফেলে রাখা, বৈদ্যুতিক লাইনে অবহেলা, দোকানপাটে রাতভর হিটার চালিয়ে রাখা এসব ক্ষুদ্র ভুলই বড় বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। সমস্যা হলো, এসব অভ্যাস পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতনতা খুব কম।
ঢাকার কোরাইল বস্তি যেন প্রতি শীতেই নতুন করে আগুনের আতঙ্কে কাঁপে। কয়েক বছর ধরে বারবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার এই বস্তিতে ঘরগুলো টিন, কাঠ, পলিথিন আর কাপড়ের তৈরি যা আগুনের জন্য অত্যন্ত দাহ্য। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডেও কোরাইলে অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ছোট ব্যবসার মালামাল মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায়। সরু গলি, পানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও দমকলের ঢুকতে অসুবিধা সব মিলিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অগ্নিকাণ্ড শুধু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয় না; ছোট ব্যবসার মালিক, দিনমজুর, নিম্নবিত্তের পরিবার সবার জীবনে অনির্বচনীয় ধাক্কা বয়ে আনে। এক রাতের আগুনে দোকানের পুঁজি, ঘরের সামান্য আসবাব, বছরের পর বছর গড়ে ওঠা স্বপ্ন সব মুহূর্তেই মুছে যায়।
ফায়ার সার্ভিস বারবার নিরাপত্তা নির্দেশনা জারি করলেও অধিকাংশ জায়গায় সেগুলো মানার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। আগুন লাগার পর উদ্ধারই হয়ে ওঠে প্রধান কাজ প্রতিরোধ এখনো দূরে।
অগ্নিকাণ্ড শুধু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয় না; ছোট ব্যবসার মালিক, দিনমজুর, নিম্নবিত্তের পরিবার সবার জীবনে অনির্বচনীয় ধাক্কা বয়ে আনে। এক রাতের আগুনে দোকানের পুঁজি, ঘরের সামান্য আসবাব, বছরের পর বছর গড়ে ওঠা স্বপ্ন সব মুহূর্তেই মুছে যায়।
শীতকালীন অগ্নিকাণ্ডকে প্রতিবারের দুর্ভাগ্য হিসেবে না দেখে এটিকে প্রতিরোধযোগ্য দুর্যোগ হিসেবে ভাবতে হবে। কিছু নিয়ম মেনে চলা, সামান্য সচেতনতা এবং কাঠামোগত পরিবর্তনই মানুষের জীবনে বড় বিপর্যয় ঠেকাতে পারে।