এক যুগের কাছাকাছি সময় ধরে এই প্রশ্ন বুকে নিয়ে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার সুন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দা শাহীন সুরমা। ছেলে একরাম হোসেন স্মরণ হত্যার বিচার না পেয়ে তিনি আজ ক্লান্ত, হতাশ; তবুও ন্যায়বিচারের আশায় লড়াই থামাননি। স্থানীয় সূত্র ও মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১ জুন রাতে চাটখিল বাজারের মেসার্স মুন ফার্নিচার স্টোরে বার্নিশের কাজ করা একরাম হোসেন স্মরণকে একদল সন্ত্রাসী কৌশলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা তার দুটি পা ভেঙে দেয় এবং দাঁতের মাড়ি উপড়ে ফেলে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে চাটখিল সদর হাসপাতালে, পরে মাইজদী হয়ে ঢাকায় নেওয়া হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো যায়নি স্মরণকে। ২০১৫ সালের ৫ জুন রাত ৮টা ৪০ মিনিটে ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
‘মীমাংসা না করলে বাকি সন্তানদেরও একই পরিণতি’
স্মরণের মা শাহীন সুরমার অভিযোগ, ঘটনার পর অভিযুক্তদের একটি পক্ষ প্রথমে সামাজিকভাবে মীমাংসার প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি হুমকি দিয়ে বলে, “সামাজিকভাবে না বসলে তোমাকেও তোমার বাকি সন্তানদের একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।”
এসব হুমকি উপেক্ষা করে তিনি ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট আদালতে ১৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে চাটখিল থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
মামলার আসামিরা হলেন:
মিলন,সজীব,হুক্কা, মানিক,কামাল, হালিম,শাহজাহান,
বিপ্লব,জান্নাতুল ফেরদৌস,বাবুল,রুবেল, কবির আহমদ,আক্তার,ইসমাইল,মো. সুজন,তোফায়েল আহমদ, অব্যাহতি পেলেও থামেনি মায়ের লড়াই
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর, নোয়াখালী আমলি আদালত নং–৭ এর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাঈদী নাহী সব আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করেন।এই আদেশে ভেঙে পড়েন শাহীন সুরমা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,“আমার সন্তানের বিচার বুঝি এ জন্মে আর পেলাম না।” তবে হাল ছাড়েননি তিনি। আইনের প্রতি আস্থা রেখে ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নোয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। আদালত তা গ্রহণ করেন। বর্তমানে ফৌজদারি রিভিশন মামলা নং–১৩৮, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৫/৪৩৬/৪৩৯(এ) ধারায় বিচারাধীন রয়েছে।‘প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না’স্থানীয় কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনাটি এলাকায় বহুল আলোচিত। তাদের দাবি, অভিযুক্তরা প্রভাবশালী ও অর্থশালী হওয়ায় নিরাপত্তার অভাবে কেউ প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতে সাহস পাচ্ছেন না। এদিকে ১১ বছর পার হলেও ছেলে হত্যার বিচার না পেয়ে মা শাহীন সুরমা এখনো আশায় বুক বাঁধেন—একদিন হয়তো আদালত তার সন্তানের হত্যার বিচার নিশ্চিত করবে।