দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের মধ্যে সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের ঘাটতি নেই, তবে কিছু এলাকায় সংকটের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছে বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও জ্বালানি বিভাগ প্রতিদিন সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে সীমিত সরবরাহ, কার্গো বিলম্ব এবং অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সরকার বলছে, এই সংকটের পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে অবৈধ মজুদদার ও চোরাকারবারিদের তৎপরতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বেশ কয়েকটি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘ফুয়েল পাস’ বা ফুয়েল কার্ড চালুর উদ্যোগ। কিউআর কোডভিত্তিক এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট যানবাহনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, কারণ এই খাতে অকটেনের চাহিদা তুলনামূলক বেশি এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্যানিক বায়িংও বেশি দেখা গেছে।
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার জেলা প্রশাসন, ভিজিল্যান্স টিম এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়িয়েছে। ফিলিং স্টেশন পর্যায়ে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে জ্বালানি মজুদ ও পাচারের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে সরকার। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যাচাই শেষে তথ্যদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে এবং পরিচয় গোপন রাখা হবে।
সরকারি সূত্রে আরও জানানো হয়েছে, মার্চ ও এপ্রিল মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জ্বালানি সরবরাহ বেড়েছে। বিশেষ করে সেচ মৌসুম বিবেচনায় কৃষি খাতে ডিজেল সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের কাছে সরাসরি জ্বালানি পৌঁছানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। তবে কার্গো বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে চাপ পুরোপুরি কমেনি।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তার ভাষায়, কিছু মহল কৃত্রিম সংকট তৈরির পাঁয়তারা করছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ যতদিন চলবে ততদিন পাচার, মজুদদারি ও অযৌক্তিক তেল সংগ্রহের প্রবণতা ঠেকাতে সরকার কঠোর থাকবে। তিনি আরও জানান, বিশ্বে নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে এবং শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপালসহ অনেক দেশ ইতোমধ্যে দাম বাড়িয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।
সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়িয়েছে। রাশিয়া থেকে ছয় লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুরোধ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, এঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে দুটি কার্গো এবং অস্ট্রেলিয়া ও এঙ্গোলা থেকে এলএনজি পাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের উদ্বৃত্ত মজুদ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। মার্চে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখা হয়েছে এবং ঈদ উপলক্ষে কিছু ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ বাড়ানো হয়েছিল। তবে বাস্তব পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীর অনেক ফিলিং স্টেশনে আগে যেখানে দৈনিক ৯ থেকে ১০ হাজার লিটার সরবরাহ দেওয়া হতো, এখন তা কমে ৪ থেকে ৫ হাজার লিটারে নেমে এসেছে। কোনো কোনো স্টেশনে দিনে একটি ট্যাংকার পাওয়া গেলেও কোথাও তা-ও মিলছে না।
এদিকে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরির বড় কারণ হিসেবে কার্গো বিলম্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মার্চ মাসে দুটি অকটেন কার্গো নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছায়নি। পাশাপাশি ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টনের পাঁচটি ডিজেল কার্গো স্থগিত রয়েছে এবং আরও প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টনের সরবরাহ বিলম্বিত হয়েছে। এসব কারণে বাজারে সাময়িক সংকট অনুভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সভা হচ্ছে এবং প্রতিদিন তেল সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে এবং মামলা, জরিমানা ও কারাদণ্ডের মাধ্যমে অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সরকার দাবি করছে, দেশে জ্বালানি তেলের মৌলিক সংকট নেই, তবে অতিরিক্ত চাহিদা, প্যানিক বায়িং, কার্গো বিলম্ব এবং মজুদদারদের তৎপরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। সামনে যুদ্ধ পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তার ওপরই সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।