কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মানিকপুর এলাকায় পরিবেশবান্ধব ঝিকঝাক চিমনির তিনটি ইটভাটা ভেঙে দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের একটি টিম। রোববার (১৬ নভেম্বর) দুপুরে পরিচালিত এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক জমির উদ্দিন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল করিম। অভিযানে র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা অংশ নেন।
ভুক্তভোগী ইটভাটা মালিকরা জানান, অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া তিনটি ভাটাতেই কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তাদের অভিযোগ—নির্দেশনা লঙ্ঘন করে পরিবেশবান্ধব ঝিকঝাক চিমনির ভাটাগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে; অথচ ড্রাম চিমনি ও ১২০ ফুট ফিক্সড চিমনির ভাটাগুলোতে অভিযান হয়নি।
চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, রামু ও বান্দরবান অঞ্চলে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বিদ্যালয় ও সড়ক নির্মাণে স্থানীয় ইটভাটার উৎপাদিত ইটই মূল উপকরণ। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে মানিকপুর ও ফাইতং এলাকার ইটভাটা এই অঞ্চলের নির্মাণশিল্পকে সচল রেখেছে।
স্থানীয় প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য—
“ইটভাটা বন্ধ হলে চট্টগ্রাম পর্যন্ত নির্মাণসামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দেবে; বাড়বে দাম, থমকে যাবে নির্মাণ ও উন্নয়নকাজ।”
মানিকপুরের পাঁচটি ও ফাইতংয়ের ২৫টির বেশি ইটভাটায় প্রতিদিন কাজ করেন ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক। কেউ কাঁটা শ্রমিক, কেউ কাদা শ্রমিক, আবার কেউ লোডিং–আনলোডিংয়ের কাজ করেন—এই ভাটাগুলোই তাদের একমাত্র জীবিকা।
শ্রমিকদের অভিযোগ—
“ইটভাটা ছাড়া আমাদের বিকল্প কোন কাজ নেই। কাজ বন্ধ হলে পরিবার নিয়ে অনাহারে পড়ব।”
মানিকপুরের অভিযান শেষে প্রশাসনের টিম যখন ফাইতংয়ে আরও ভাটা উচ্ছেদে যায়, তখন শত শত শ্রমিক কাফনের কাপড় পরে রাস্তার ওপর শুয়ে বিক্ষোভ করেন। শ্রমিক–মালিকদের মানববন্ধনে পাহাড়ি সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে প্রশাসন দুই দিনের জন্য অভিযান স্থগিত ঘোষণা করে।
ইটভাটা মালিকদের দাবি—
চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পরিবেশ উপদেষ্টা জেলা প্রশাসকদের কাছে নির্দেশ দেন প্রথমে শুধু ড্রাম চিমনি ও ১২০ ফুট ফিক্সড চিমনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
কিন্তু প্রশাসন সেই নির্দেশনা অমান্য করে পুরো নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব ঝিকঝাক চিমনির ভাটাগুলো ভেঙে দিয়েছে।
সম্ভাব্য ক্ষতির চিত্র
*২০ হাজার শ্রমিক বেকার হওয়ার ঝুঁকি
*স্থানীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা
*ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো নির্মাণ ধীরগতির শঙ্কা
*সরকারি–বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির হওয়ার সম্ভাবনা
*ইটের দাম বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের ঘর নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
শ্রমিকদের ঘোষণা
রোববারের মানববন্ধনে শ্রমিকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন—
“আমাদের কর্মসংস্থান বাঁচাতে আমরা কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলব। জীবিকার এই কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হতে দেব না।”
সচেতন নাগরিকরা বলছেন—হঠাৎ করে ইটভাটা উচ্ছেদ করে হাজার হাজার শ্রমিককে কর্মহীন করে দিলে তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করবে।
তাদের প্রশ্ন—
“শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে ভাটা বন্ধ করে দিলে এই বিপর্যয়ের দায় কে নেবে?”
তাদের মতে—পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনে ভাটা উচ্ছেদ করতে হলে আগে শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।
“কর্মসংস্থান ধ্বংস করে পরিবেশ রক্ষা হয় না; বরং মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।”