এই দেশ, এই দেশের মানুষ—এর বাইরে তাঁর কোনো ঠিকানা নেই। হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলা সেই一 আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিধ্বনিত হয়—এই দেশ ছেড়ে, এই দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সামান্য সমঝোতার পথ বেছে নিলে আরাম-আয়েশের জীবন বেছে নিতে পারতেন, কারাবরণ কিংবা নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতো না। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও জনগণের পাশে থাকার কঠিন পথ।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সিংহভাগ সময়ই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে কেটেছে খালেদা জিয়ার। ১৯৮১ সালের ৩০ মে সামরিক অভ্যুত্থানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান নিহত হলে নেতৃত্বহীন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দলটি। সেই সংকটময় সময়ে দুই সন্তানকে নিয়ে ব্যক্তিগত শোক বুকে চেপে রেখে রাজনীতির কঠিন ময়দানে সামনে আসেন খালেদা জিয়া। দল পুনর্গঠনের পাশাপাশি তিনি সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে তাঁর নেতৃত্বেই স্বৈরশাসনের পতন ঘটে।
এর পরের বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা বা না থাকা—কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি আপস করেননি। ভয় কিংবা লোভ, কোনোটির কাছেই তিনি মাথা নত করেননি।
ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আপস না করায় তাকে কারাবরণ করতে হয়। শুধু তাই নয়, সে সময় তার দুই ছেলে নানা নির্যাতনের শিকার হন। এক জনসভায় খালেদা জিয়া প্রকাশ্যে বলেছিলেন, মইনুদ্দিন ও ফখরুদ্দিন তার সঙ্গে কথা বলে দেশ ছাড়তে চাপ দিয়েছিলেন। তিনি যেতে রাজি না হওয়ায় তার সন্তানদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তাকে বলা হয়েছিল, দেশ না ছাড়লে মামলা দেওয়া হবে, ছেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া হবে।
সেই সমাবেশেই তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, আমি দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষকে ছেড়ে কোথাও যাব না। এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। দেশের বাইরে আমার কিছু নেই। আপনাদের ছেড়ে না যাওয়ার কারণেই আমার ছেলেদের ওপর এত নির্যাতন হয়েছে, আমাকে জেলে যেতে হয়েছে, কিন্তু আমি জনগণকে ছেড়ে যাইনি। মইনুদ্দিন–ফখরুদ্দিনের সঙ্গে কোনো আপসও করিনি।
পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনামলেও তাকে আবার কারাবরণ করতে হয়। রায় ঘোষণার কিছুদিন আগে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা দাবি করেছিল, তিনি আর দেশে ফিরবেন না। কিন্তু সব আশঙ্কা ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে তিনি দেশে ফিরে আসেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই দেশে ফেরেন এবং পরে দীর্ঘ তিন বছর কারাগারে কাটাতে হয় তাকে। সে সময়ও রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া বা দেশ ছাড়ার নানা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু আপসহীন নেত্রী কোনো অবস্থাতেই নিজের আদর্শ থেকে সরে দাঁড়াননি।
এই অটল দেশপ্রেম, সাহস ও আপসহীনতার প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৮০ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর চলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে রেখে গেল এক গভীর শূন্যতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেল আপসহীন থাকার এক শক্তিশালী উদাহরণ।