দীর্ঘ ১২ বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে খুলনায় চালু হলো দেশের অন্যতম আধুনিক ও বৃহৎ কেন্দ্রীয় কারাগার। শনিবার (১ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয় খুলনা আধুনিক কারাগারটি। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিনটি প্রিজন ভ্যানে করে পুরাতন কারাগার থেকে প্রথম দফায় ১০০ জন কয়েদিকে স্থানান্তর করা হয়।
নতুন এই কারাগারে প্রবেশের পর বন্দিদের স্বাগত জানানো হয় গোলাপ ও রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে। ফুল দিয়ে কয়েদিদের বরণ করার এই উদ্যোগে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) মো. মনির আহমেদ, খুলনা জেলা কারাগারের জেল সুপার নাসির উদ্দিন প্রধান, ডেপুটি জেল সুপার আব্দুল্লাহ হেল আল আমিন এবং জেলার মুহাম্মদ মুনীরসহ কারা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
কারা উপমহাপরিদর্শক মনির আহমেদ বলেন, “পুরাতন কারাগার থেকে প্রথম দফায় ১০০ বন্দিকে আনা হয়েছে। ধীরে ধীরে বন্দির সংখ্যা বাড়ানো হবে। ভবিষ্যতে মেট্রোপলিটন এলাকার বন্দিরা পুরাতন কারাগারে থাকবে, আর বাইরের এলাকার বন্দিরা এই নতুন কারাগারে থাকবে। এখানে বন্দিরা খোলামেলা পরিবেশে ভালোভাবে থাকতে পারবে।”
তিনি আরও জানান, “এখন খুলনায় ধারণ ক্ষমতার বাইরে বন্দি থাকার অভিযোগ থাকবে না। এই কারাগারে হাসপাতাল, সমাজসেবা অফিস, লাইব্রেরি, ডে কেয়ার সেন্টারসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। বন্দিদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্যও থাকবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।”
জেল সুপার নাসির উদ্দিন প্রধান বলেন, “পুরাতন কারাগারের ধারণক্ষমতা ৬৭৮ জন, কিন্তু বর্তমানে বন্দি রয়েছে প্রায় ১,৫০০ জন। নতুন কারাগারে ধারণক্ষমতা ২,০০০ জন, ভবিষ্যতে তা ৪,০০০ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন কারাগারটি ৩০ একর জমির ওপর নির্মিত, যেখানে রয়েছে ৫৭টি স্থাপনা এবং বন্দিদের থাকার জন্য ১১টি আলাদা ভবন।”
তিনি জানান, নারী ও পুরুষ বন্দিদের জন্য রয়েছে পৃথক ডিভিশন, আলাদা চিকিৎসা ইউনিট ও রান্নাঘরের ব্যবস্থা—যা দেশের অন্য কোনো কারাগারে কাশিমপুর ছাড়া নেই। উচ্চমানের ফাঁসির মঞ্চ, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কারারক্ষীদের জন্য আবাসন ও স্কুলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে একনেক সভায় খুলনা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রাথমিক বাজেট ছিল ১৪৪ কোটি টাকা, যা পরে দুই দফায় সংশোধিত হয়ে দাঁড়ায় ২৮৮ কোটি টাকায়। রূপসা ব্রিজ-সংলগ্ন খুলনা সিটি বাইপাস সড়কের পাশে ৩০ একর জমিতে নির্মিত এই কারাগারে রয়েছে রঙিন ভবন, মসজিদ, হাসপাতাল, পাকা রাস্তা, টাইলস করা ফুটপাত, পার্কিং স্পেস ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ কারাগার কমপ্লেক্স। বন্দিদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পুরো এলাকায় নির্মিত হয়েছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীর।
কারাগারের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নির্মিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে আধুনিক ফাঁসির মঞ্চ, যা ছাই রঙের টিনের ছাউনি ও ঢেউটিনের কাঠামোয় নির্মিত। দীর্ঘ সময় ধরে অচল থাকা এই প্রকল্প চালু হওয়ায় খুলনাবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে স্বস্তি ও প্রত্যাশা।