ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় হাম-বসন্তসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় প্রায় ছয় দশক ধরে পালিত হয়ে আসছে বিশেষ ধর্মীয় আচার ‘শীতলা পূজা’। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অত্যন্ত ভক্তি ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এই পূজা সম্পন্ন করেছেন।
শনিবার (১১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মালোপাড়া গ্রামে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও গ্রামের নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরসহ সর্বস্তরের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের এই ধর্মীয় উৎসবে অংশ নেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী শীতলা মূলত (‘আরোগ্যদায়িনী’দেবী) প্রাচীনকাল থেকেই ভক্তরা বিশ্বাস করে আসছেন যে, গুটিবসন্ত, জলবসন্ত, হাম এবং বিভিন্ন চর্মরোগ নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। তাঁর হাতের কলস থেকে শীতল জল ছিটিয়ে তিনি অসুস্থদের শরীরের জ্বালা ও কষ্ট উপশম করেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষে গুটিবসন্ত নির্মূল হলেও, যেকোনো সংক্রামক ব্যাধি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার আশায় সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ আজও দেবীর আরাধনা করে থাকেন।
পূজা উপলক্ষে মালোপাড়া গ্রামজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ঢাক-ঢোলের তালে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এদিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল গ্রামবাসীদের কাদা- মাটিতে মেতে ওঠা।আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠে একে অপরকে কাদা মাখিয়ে তারা উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। স্থানীয়দের মতে, এই কাদা মাখামাখি তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষরা এই পূজার প্রচলন করেছিলেন। সে সময় এলাকায় হাম ও বসন্তের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করায় রোগ থেকে মুক্তির আশায় এই পূজার সূচনা হয়। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভক্তিভরে এই আয়োজন চলে আসছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে “আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হলেও এই ঐতিহ্যবাহী পূজা আমাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের গভীরে মিশে আছে। এটি শুধু রোগমুক্তির প্রার্থনা নয়, বরং আমাদের গ্রামবাসীর ঐক্য এবং সম্প্রীতির একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। তাঁরা আরো বলেন, ধর্মীয় গন্ডি ছাড়িয়ে এই “শীতলা পূজা” এখন সদরপুরের লোকজ সংস্কৃতির এক অনন্য ঐতিহ্যে রুপ নিয়েছে, যা যুগ যুগ ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও গ্রামীণ সংহতিকে টিকিয়ে রাখছে।