সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া জুলাইযোদ্ধাদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে সরকার। তিনি বলেন, সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামা সরকার মেনে চলবে এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার হত্যার বিচার যেমন সম্ভব নয়, তেমনি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে যারা নিহত হয়েছেন, সেটিও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা এর বিচার হবে না বলেও জানান তিনি।
সোমবার (৩০ মার্চ) ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের চতুর্থ দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান তুলে ধরে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রশ্নোত্তর পর্বে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান, গত ১৬ বছরে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যারা আইন অমান্য করে নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল এবং জুলাইয়ে যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন ও নিপীড়নে অংশ নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভাগীয় পদক্ষেপ নেবে কিনা। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ‘পুলিশ হত্যার বিচার’ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে, এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ কী।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী জুলাইযোদ্ধাদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষায় সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে ‘জুলাইযোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করেছে, যা সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। অধ্যাদেশটিকে বিল আকারে পাস করতেও সরকার একমত হয়েছে বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘পুলিশ হত্যার বিচার’ দাবিকে নাকচ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে যে প্রচারণা চালাচ্ছে, তা বিভ্রান্তিকর। তিনি বলেন, যদি সেই যুক্তিতে বিচার করা হয়, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার করতে হবে যারা ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে গণহত্যা করেছে, তারা জনতার প্রতিরোধের মুখে হতাহত হয়েছে, কিন্তু সেটি যুদ্ধের ময়দানে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে কেউ হতাহত হয়ে থাকলে এর বিচার হবে না। তবে তিনি জানান, জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞের বিচার অবশ্যই হবে। পুলিশের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড নিয়ে নির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং কিছু মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, কিছু মামলা সাধারণ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলার রায়ও হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, আদালত স্বাধীনভাবে বিচার পরিচালনা করবে, সরকার কোনোভাবেই এতে হস্তক্ষেপ করবে না। এদেশে সংঘটিত সকল গুম, খুন, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার বিচার হবে বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ সময় বিএনপির এমপি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের দায়ের করা বহু মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এসব মামলা প্রত্যাহার করে নেতাকর্মীদের হয়রানি থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পুলিশ নির্যাতন করে একজন যুবদল নেতাকে অন্ধ করে দিয়েছে এবং আরেকজন রাস্তায় নিহত হয়েছেন, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পুলিশের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়জুড়ে জনগণের ওপর গায়েবি মামলা, মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা, গুম, খুন, অপহরণসহ ব্যাপক অনাচার হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য এসব অপকর্মে যুক্ত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। টাঙ্গাইলের ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিস্তারিত নোটিশ পেলে অগ্রগতির বিষয়টি জানানো সম্ভব হবে।
মামলা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারি দল, বিরোধী দল, অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কিছু মিথ্যা মামলা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই করে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।