পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে। ফলে শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ থামাতে এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম) নিয়ে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের একটি সূত্র, দুইজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পাকিস্তানি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, “আমরা খুব শিগগির যুদ্ধ শেষ করতে যাচ্ছি। আমরা খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।”
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বাস করছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে এক পাতার এই সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে তারা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে চলমান মার্কিন নৌ মিশন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করেন, যা আলোচনার অগ্রগতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কিংবা হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক পাতার ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকটি মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার এবং ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হচ্ছে।
খসড়া অনুযায়ী, এই স্মারকের মাধ্যমে অঞ্চলটিতে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত চুক্তি চূড়ান্ত করতে ৩০ দিনের আলোচনা সময় নির্ধারণ করা হবে।
এই আলোচনায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমে সাময়িক বিরতি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দকৃত কয়েক বিলিয়ন ডলার মুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ দিনের আলোচনার সময়সীমার মধ্যে ইরানের আরোপিত জাহাজ চলাচল নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হতে পারে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় অবরোধ আরোপ কিংবা সামরিক অভিযান শুরু করতে পারবে।
উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি নৌ অভিযান শুরু করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা। তবে এই অভিযানের সময় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাধিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
সাম্প্রতিক ঘটনায় একটি ফরাসি জাহাজ কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের একটি কনটেইনার জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে এবং আহত নাবিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
চীনে সফরকালে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরাসরি যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কিছু না বললেও “ন্যায়সংগত ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তির” ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেছেন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোতে পৃথক অবরোধ আরোপ করে।
এ সময় ইরানের হামলায় একাধিক পণ্যবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি বন্দরগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে ইরানের বিরুদ্ধে।
সব মিলিয়ে আলোচনার এই চূড়ান্ত পর্যায় সফল হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।