আটলান্টিক মহাসাগরে ভ্রমণরত ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের একটি প্রমোদতরিতে হান্টা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রমোদতরিতে তিনজন যাত্রীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এ ছাড়া চিকিৎসার জন্য আরও চারজনকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যেসব যাত্রী ভাইরাসটির সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন, তাদের শনাক্ত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ অনেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ফিরে গেছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ জনগণের জন্য ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তবে যেহেতু ভাইরাসটির একটি স্ট্রেইন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে ছড়াতে পারে, তাই সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমভি হন্ডিয়াস নামের প্রমোদতরিটি ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার দক্ষিণতম শহর উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করে। ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস পরিচালিত বিলাসবহুল এই ক্রুজটি আর্জেন্টিনা থেকে ব্রিটিশশাসিত দক্ষিণ জর্জিয়া অঞ্চলে যাওয়ার কথা ছিল। যাত্রার শুরুতে জাহাজে ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন বলে জানা গেছে।
১১ এপ্রিল জাহাজে একজন ডাচ নাগরিক মারা যান। পরে ২৪ এপ্রিল তার মরদেহ সেন্ট হেলেনায় নামানো হয়। কিছুদিন পর তার স্ত্রীকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হলে জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ৬৯ বছর বয়সী ওই নারী হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। এরপর ২ মে জাহাজের এক জার্মান যাত্রীও মারা যান। এতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিনজনে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভাইরাসটির অ্যান্ডিস স্ট্রেইন, যা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে ছড়াতে পারে, জাহাজ থেকে দেশে সরিয়ে নেওয়া দুই ব্যক্তির শরীরে শনাক্ত হয়েছে।
হান্টা ভাইরাস হলো এমন এক ধরনের ভাইরাস, যা সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে থাকে। এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়ায় মূলত ইঁদুরের মল, প্রস্রাব বা লালা থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণার মাধ্যমে, যা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি জানিয়েছে, বিরল ক্ষেত্রে ইঁদুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে।
এই ভাইরাস দুটি গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমটি হান্টা ভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস), যার শুরুতে জ্বর, ক্লান্তি ও পেশীতে ব্যথা দেখা যায় এবং পরে শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের জটিলতা তৈরি হয়। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, শ্বাসজনিত উপসর্গ দেখা দিলে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৮ শতাংশ। দ্বিতীয়টি হলো হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (এইচএফআরএস), যা কিডনিকে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত করে এবং নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও কিডনি বিকলতা পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর আনুমানিক ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে হান্টাভাইরাসের গুরুতর সংক্রমণ দেখা যায়। এর বড় অংশ ঘটে ইউরোপ ও এশিয়ায় এবং সংক্রমণের অর্ধেকেরও বেশি সাধারণত চীনে পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৩ সালে নজরদারি শুরু হওয়ার পর ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৮৯০টি কেস শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, নরওয়ে ইঁদুর বা ব্রাউন র্যাটের মাধ্যমে বহন করা সিউল ভাইরাসও হান্টাভাইরাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন, যা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়।
হান্টাভাইরাস সংক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সিডিসি জানিয়েছে, উপসর্গ অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসাই মূল পদ্ধতি। গুরুতর অবস্থায় অক্সিজেন থেরাপি, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এবং প্রয়োজনে ডায়ালাইসিস দিতে হতে পারে। অনেক রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি করতে হয় এবং মারাত্মক ক্ষেত্রে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা নিতে হয়।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, এমভি হন্ডিয়াসে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ‘মহামারির সূচনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সংস্থাটির মহামারি বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কেরখোভে বলেছেন, এটি কোভিড বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো দ্রুত ছড়ায় না, কারণ হান্টাভাইরাস মূলত ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ সংস্পর্শে ছড়ায়।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের তুলনায় অ্যান্ডিস স্ট্রেইন ততটা সহজে ছড়ায় না। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ সম্ভব হলেও বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি কম বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস ঘেব্রেইয়েসুস জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন আক্রান্তদের শনাক্ত এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। ভাইরাসটির ইনকিউবেশন সময় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে, তাই সামনে আরও কিছু সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়ি বা কর্মস্থলে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে রাখা, ইঁদুর প্রবেশের পথ বন্ধ করা এবং ইঁদুরের মল পরিষ্কার করার সময় মাস্ক ও সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন রোগীদের সংস্পর্শে থাকলে উচ্চমাত্রার ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।