রাত তখন প্রায় আড়াইটে। শহরের বেশিরভাগ মানুষই ঘরের ভেতর মোটা কম্বল গায়ে দিয়ে গভীর ঘুমে। রাস্তায় লাইটগুলো ঝিম ধরে জ্বলছে, দোকানের শাটার নামানো, রিকশা-ভ্যান অনেক আগেই অদৃশ্য। এই নীরবতার ভেতরেও একটা জায়গা থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে—গলির এক কোণে বসে আগুন পোহাচ্ছে একজন মানুষ। তার গায়ে জড়ানো একটি পুরনো, ছেঁড়া চাদর। এমন চাদর, যেটা দিয়ে শীতকে রোখা নয়, বরং শুধু শরীর ঢেকে রাখা যায় কোনোরকমে।
লোকটির নাম রফিক। বয়স হবে পয়ত্রিশ -ছত্রিশ মতো। মাথাভর্তি সাদা চুল, কিন্তু জীবনের ভারে আরও দশ বছর বেশি মনে হয় তাকে। দিনের বেলা শহরের ফুটপাতে ঠেলাগাড়ি চালিয়ে খেলা-ধুলার সরঞ্জাম বিক্রি করে। কখনো আবার ভ্যান ভাড়া নিয়ে মাল টানার কাজ করে। কিন্তু শীত এলে কাজ কমে যায়, যাদের হাতে টাকা থাকে তারা কিনে—আর যাদের থাকে না, তাদেরও জীবন থেমে থাকে ঠান্ডার কামড়ে।
রফিক আগুনের দিকে হাত বাড়ালো। কনকনে হাওয়ার দাপটে হাত দুটো কাঁপছে। তিনি জানেন—এই আগুন যতক্ষণ আছে ততক্ষণই বাঁচা। ভোরের দিকে আগুন নিভে গেলে ঠান্ডা আবার তীক্ষ্ণ ছুরির মতো এসে বিঁধবে হাড়ে। তবু তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে আগুনের নড়চড় দেখছেন তিনি, যেন আগুনের ছোট ছোট শিখাগুলোই আশ্বাস দিচ্ছে—“আরও কিছুক্ষণ থাকো, তুমি একা নও।”
ছেঁড়া চাদরটা ঠিক করতে করতে রফিক বলেন, “শীত লাগলেই কষ্টটা মনে হয় বেশি। সারাদিন খাটুনি, রাতে গরম কাপড় নাই… আগুন না ধরলে টিকাই যাইতাম না।” তাঁর কথার ভেতর কোনো অভিযোগ নেই, শুধু বাস্তবতা—যা তিনি প্রতিদিনের মতো মেনে নেন।
শহরের মানুষ শীতকে উৎসব বলে মনে করে—নতুন সোয়েটার, গরম কাপড়ের ফ্যাশন, সকালবেলা কফির কাপ। কিন্তু রফিকের মতো মানুষের কাছে শীত মানেই আতঙ্ক। শীতের প্রতিটি রাত মানেই অনিশ্চয়তা। কোথায় আশ্রয় মিলবে, কোথায় আগুন জ্বালানো যাবে, কোথায় কুকুর বা লোকজনের ভয় নেই—এসবই হলো তাদের প্রতিরাতের প্রশ্ন।
আজকের রাতেও রফিকের পাশে কেউ নেই। তার আগুনটা জ্বালানো হয়েছে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা কাঠ-কাগজ জড়ো করে। মাঝে মাঝে বাতাসে আগুন দপ করে নড়ে ওঠে, আবার ছোট হয়ে আসে। সেই নড়াচড়ার ওপরই যেন নির্ভর করে রফিকের নিঃশ্বাস—আগুন নিভে গেলে যে ঠান্ডা তার অপেক্ষায় আছে।
তার ছেঁড়া কাপড়ের দিকে তাকালে বোঝাই যায়—একটা শীত পার করা তার জন্য কত বড় চ্যালেঞ্জ। জুতার সামনে ফেটে গেছে, মোজা নেই, হাতের আঙুলে কাঁপুনি। তবু তিনি বসে থাকেন। কারণ এই আগুনই এখন তার সবচেয়ে বড় বন্ধু।
“মানুষ দেখলে ভাবে, রাস্তার মানুষদের সমস্যা বুঝি শুধু খাবার,”—রফিক নরম গলায় বলেন,—“কিন্তু ঠান্ডার রাতে খাবারের চেয়েও বড় সমস্যা হইল আগুন। গরম থাকলে ঘুম আসে, ঘুম এলে সারা দিনের ক্লান্তি কেটে যায়… ঠান্ডায় ঘুমই আসে না।” তাঁর কথাগুলো রাতে আরও ভারি শোনায়।
দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসতে শুরু করেছে। মানে রাত ফুরোতে চলেছে। রফিক জানেন, ভোরের ঠান্ডা সবচেয়ে নির্মম। তাই তিনি আগুনে আরেকটু কাগজ ছুঁড়ে দেন। আগুন হঠাৎ একটু উঁচু হয়ে ওঠে, যেন অন্ধকারের মধ্যে খুব ছোট একটা বিজয়।
রফিকের মতো মানুষ শহরের কোণায়-অন্তরায় হাজার হাজার আছে। তারা আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু আমরা তাদের দেখি না। আমরা জানি না, তারা কেমন রাত কাটায়, কেমন শীত পোহায়, কেমন লড়াই করে বাঁচে। আগুন পোহাতে বসে থাকা একজন মানুষ কখনোই শুধু একা নয়—তার সঙ্গে থাকে অগণিত অজানা লড়াই, ব্যথা আর আশা।
শীতকাল তাই সবার জন্য সমান নয়। কারও জন্য শীত মানে উৎসব, আনন্দ, মজা। কিন্তু কারও জন্য শীত মানে যুদ্ধ—একটা রাত পার করে আরেকটা রাত টিকে থাকা।
রফিক আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে ভোরের আলো পড়তে শুরু করেছে। শীত এখনো কামড়াচ্ছে, কিন্তু আগুনটা আছে। সেই আগুনই তাকে একটা নতুন দিনের সাহস দেয়। আগুন নিভে গেলে যে শীত তাকে গ্রাস করবে—তাও সে জানে। তবু প্রতিদিনের মতো আবার লড়বে, কারণ জীবন তাকে অন্য কোনো পথ দেয়নি।
এই আগুন, এই ছেঁড়া চাদর, আর এই মানুষের ভোরে ফিরে আসার অপেক্ষা—সব মিলিয়ে সত্যি করে বলে দেয়: শীত কখনোই সবার জন্য আশীর্বাদ নিয়ে আসে না; কারও কারও জন্য শীত মানে কেবল টিকে থাকার সংগ্রাম।