১৯৮৭ সাল।একটি ছোট মফস্বল শহরের একচালা টিনের ঘরে, বইয়ের ভেতর লুকিয়ে রাখা একটি চিঠি আজও হলুদ হয়ে ঝরছে। এই চিঠিই ছিল রুহুল আর শারমিনের প্রেমের শেষ প্রমাণ।
তখন মোবাইল তো দূরের কথা, বাড়িতে টেলিফোন ছিল না কারো। প্রেম হতো চিঠির পাতায় পাতায়। রুহুল তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে, প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পর ভাঙা হারমোনিয়ামে “চোখ যে মনের কথা বলে” গাইতো। শারমিন ছিল পাশের গ্রামের মেয়ে, লাজুক, শান্ত আর চোখে ছিল চিরন্তন বিষণ্ণতা।
তাদের দেখা হতো কখনো গ্রাম্য মেলায়, কখনো খালের পাশে তালগাছের ছায়ায়। কিন্তু কথা হতো কেবল চিঠির মাধ্যমে। রুহুল রোজ রাতে চিঠি লিখত — সাদা কাগজে, নীল কালি দিয়ে। সেই চিঠিতে থাকত কবিতা, শেকসপিয়ারের কিছু লাইন, আর একটা প্রশ্ন:
“তুমি কি আমায় বিশ্বাস করো?”
শারমিনের চিঠি আসত দু’দিন পর পর। প্রতিটি চিঠিতে সে লিখত —
“তোমার লেখা গানের কলিগুলো পড়ে আমি কেঁদে ফেলি রুহুল।”
তাদের প্রেম ছিল মাটির মত নিঃশব্দ, আকাশের মত গভীর। কিন্তু একদিন, হঠাৎ করেই সব থেমে গেল। শারমিনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল এক প্রবাসীর সঙ্গে। চিঠি এল আর একটাও না। রুহুল কেবল শেষবার একটি চিঠি পাঠাল, অনেকগুলো গানের লাইন লিখে, নিচে ছোট করে লিখেছিল —
“তুমি যদি কখনও ফিরে তাকাও, আমি এখানেই আছি — পুরনো বইয়ের ভাঁজে, সেই চিঠির পাতায়।”
তারপর কেটে গেছে চল্লিশ বছর।
আজ, রুহুল সেই পুরোনো চিঠিগুলো নিয়ে বসে থাকে, ছেলেমেয়েরা বাইরে দেশ-বিদেশে ব্যস্ত, সে কেবল একটাই কাজ করে — চিঠির গন্ধ শুকে আর ভাবে,
“চিঠির মধ্যে যে ভালোবাসা ছিল, আজকের ইমোজি আর কল-টোনে তা কই?”
ভালোবাসা হয়তো সময়ের সাথে রূপ বদলায়, কিন্তু কিছু চিঠি চিরকালই কাগজে লেখা থাকে, হৃদয়ে গেঁথে যায়।