
রোজা রাখা শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি আত্মসংযম, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য ইবাদত। পবিত্র আল-কুরআন-এ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা আল-বাকারা: ১৮৩)। এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। কিন্তু অনেকের মধ্যে একটি প্রবণতা দেখা যায়—রোজা রেখে দিনের বড় একটি অংশ অতিরিক্ত ঘুমের মাধ্যমে কাটিয়ে দেওয়া। প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দেয়?
ইসলাম ঘুমকে স্বাভাবিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি বিশ্রাম।” (সুরা আন-নাবা: ৯)। অর্থাৎ ঘুম মানুষের জন্য রহমতস্বরূপ। তবে ইবাদতের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত ঘুমে ডুবে থাকা এবং ফরজ-ওয়াজিব আমলে অবহেলা করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। রোজার মাস বিশেষভাবে ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাস। তাই এ সময়কে শুধুমাত্র ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলে রোজার আধ্যাত্মিক সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শেও আমরা ভারসাম্যের শিক্ষা পাই। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি রাতের একটি অংশ ইবাদতে কাটাতেন এবং একটি অংশ ঘুমাতেন। সহিহ আল-বুখারি-তে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “তোমার শরীরেরও তোমার উপর হক আছে।” এই হাদিস প্রমাণ করে যে শরীরের প্রয়োজন পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যেন ইবাদতের পথে প্রতিবন্ধক না হয়। একইভাবে সহিহ মুসলিম-এ এসেছে, তিনি অতিরিক্ত কষ্ট বা চরম অবহেলা—উভয় দিক থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ ইবাদতে গাফেল হয়ে যাওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি শরীরকে অযথা কষ্ট দেওয়াও নিরুৎসাহিত।
রোজা রেখে অতিরিক্ত ঘুম যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে নামাজ কাযা হয়ে যায়, কর্মক্ষেত্র বা পারিবারিক দায়িত্ব অবহেলিত হয়, তাহলে তা গুনাহের কারণ হতে পারে। কারণ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ এবং তা সময়মতো আদায় করা আবশ্যক। রোজা কোনোভাবেই নামাজ বা অন্যান্য ফরজ দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বরং রোজা মানুষের মাঝে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ববোধ বাড়ানোর কথা।
তবে কেউ যদি শারীরিক দুর্বলতা, অসুস্থতা বা ক্লান্তির কারণে কিছুটা বেশি বিশ্রাম নেন, তাহলে তা দোষের নয়। ইসলাম বাস্তবসম্মত ও মানবিক ধর্ম। কিন্তু সচেতনভাবে দিনভর ঘুমিয়ে থেকে রোজার কষ্ট এড়ানোর মানসিকতা রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। রোজা মানুষের মধ্যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও আত্মসংযম সৃষ্টি করে। তাই এই সময়কে নফল ইবাদত, দান-সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতে কাজে লাগানোই উত্তম।
সবশেষে বলা যায়, রোজা রেখে ঘুম হারাম নয়, কিন্তু অতিরিক্ত ঘুম যা ইবাদত ও দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তা অনুচিত। রোজার প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনই ইসলামের শিক্ষা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আরিফ খান
Developed by Shakil IT Park