
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে দাবি উঠেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে। শুধু শত্রুপক্ষের হামলাতেই নয়, কিছু ঘটনায় নিজেদের গুলিতেও মার্কিন বাহিনীর ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের মধ্যে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র প্রকাশ না করায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগ ও আলোচনা তৈরি করেছে, বিশেষ করে দেশটিতে আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের তথ্য গোপন করার অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এ বিষয়ে সর্বশেষ ক্ষয়ক্ষতির একটি হিসাব প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)। সংস্থাটির হিসেবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে।
সিএসআইএস-এর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান, রাডারসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ অর্থাৎ নিজেদের গুলিতেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়, মার্চের শুরুতে কুয়েতে এক ঘটনায় তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্তত একটি শক্তিশালী থাড রাডার ধ্বংস হয়, যার ক্ষতির পরিমাণ ৪৮৫ মিলিয়ন থেকে ৯৭০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির ঘটনা ঘটে ২৭ মার্চ। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া হুমকির ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ারবেসে হামলা হয়। এতে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি উন্নত রাডার নজরদারি বিমান ধ্বংস হয়, যা বহু দূর থেকে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত এবং আকাশযুদ্ধ সমন্বয় করতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কিছু তথ্য প্রকাশ করলেও রাজনৈতিক কারণে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারছে না। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের নিরাপত্তা ও সামরিক অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ওমর আশুর বলেছেন, নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসন জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে এমন তথ্য প্রকাশে আগ্রহী নয়। তার মতে, এ সময় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ পরিসংখ্যান প্রকাশ করলে জনবল হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা রাজনৈতিকভাবে প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর।
এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কিছু সামরিক সাফল্য পেলেও কৌশলগতভাবে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অতীতে ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের মতো সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র অপারেশনাল সফলতা পেলেও শেষ পর্যন্ত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক ওমর আশুর।
যুদ্ধের শুরুতে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা নৌ অবরোধ চালু করে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত ধাক্কা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ইরানও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তবে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আরিফ খান
Developed by Shakil IT Park